আজ : মঙ্গলবার ║ ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : মঙ্গলবার ║ ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ║ ১লা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: স্পেনের বিপক্ষে মাত্র ১ ফাউল করে কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য ইতিহাস

দেশচিন্তা ডেস্ক: বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচেই স্পেনকে রুখে দেওয়া কেপ ভার্দের গল্প শুধু অঘটনের নয়, শৃঙ্খলারও। আটলান্টায় ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে ০-০ গোলে আটকে দিয়ে ইতিহাস লিখেছে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি। কিন্তু সেই ড্রয়ের ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও অবিশ্বাস্য একটি পরিসংখ্যান—পুরো ম্যাচে কেপ ভার্দে ফাউল করেছে মাত্র একটি।

অপ্টা অ্যানালিস্টের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপে বিস্তারিত পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরুর পর কোনো দলের এক ম্যাচে এটিই সর্বনিম্ন ফাউল সংখ্যা। অর্থাৎ স্পেনের মতো পাসিং-নির্ভর, বল দখলে আধিপত্য করা দলের বিপক্ষে ৯০ মিনিট রক্ষণে কাটিয়েও কেপ ভার্দে প্রায় ফাউল না করেই ম্যাচ শেষ করেছে।

ফুটবলের ভাষায় এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়। এটি কেপ ভার্দের ম্যাচ পরিকল্পনা, মানসিক দৃঢ়তা এবং কৌশলগত শৃঙ্খলার প্রতীক। সাধারণত ছোট দল বড় দলের বিপক্ষে নিচে নেমে রক্ষণ করলে ফাউল বাড়ে। চাপ সামলাতে গিয়ে দেরিতে ট্যাকল, পাল্টা আক্রমণ থামাতে ইচ্ছাকৃত ফাউল, শরীরী বাধা—এসব দেখা যায়। কিন্তু কেপ ভার্দে সেই পথে হাঁটেনি। তারা জায়গা বন্ধ করেছে, শরীর দিয়ে ব্লক করেছে, কিন্তু ফাউলে ভর করেনি।

পরিসংখ্যান বলছে, ম্যাচটি প্রায় পুরোপুরি স্পেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বল দখল ছিল ৭৪ শতাংশের বেশি। মোট শট ২৭টি। লক্ষ্যে ৭টি। প্রত্যাশিত গোল ২.২৯। সম্পন্ন পাস ৮০১। শেষ তৃতীয়াংশে পাস ৪৪৩। কেপ ভার্দের ওপর চাপ ছিল অবিরাম। তবু সেই চাপে তারা ভেঙে পড়েনি, আবার বেপরোয়া ট্যাকলেও যায়নি।

কেপ ভার্দের একমাত্র ফাউলটি হয়েছে আক্রমণাত্মক অর্ধে। এই তথ্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ নিজেদের বক্সের আশপাশে স্পেনকে তারা প্রায় কোনো ফ্রি-কিক দেয়নি। দে লা ফুয়েন্তের দলের পেদ্রি, রদ্রি, গাভি, ফেরান তোরেস, পরে লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস—কেউই কেপ ভার্দের রক্ষণকে এমনভাবে টেনে বের করতে পারেননি, যাতে তারা বাধ্য হয়ে ফাউল করে।

এই শৃঙ্খলার কেন্দ্রে ছিলেন রক্ষণভাগের খেলোয়াড়েরা। পিকো লোপেস শেষ দিকে মিকেল ওয়ারজাবালের প্রায় নিশ্চিত সুযোগ ঠেকিয়ে দেন। ডিলান লিভরামেন্তো, স্টিভেন মোরেইরা, সিডনি কাবরাল, ডিজনি বোর্হেসরা বারবার জায়গা ধরে রেখেছেন। অপ্টা অ্যানালিস্টের প্রতিবেদনে বোর্হেসের পাঁচ ট্যাকল এবং পিকো লোপেসের ১১ ক্লিয়ারেন্সের কথাও উঠে এসেছে। অর্থাৎ কেপ ভার্দে শুধু ভাগ্যের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; তারা রক্ষণ করেছে নির্ভুল কাঠামোয়।

আর গোলপোস্টের নিচে ছিলেন ভোজিনিয়া। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ৭টি সেভ করে ম্যাচসেরা হন। ফেরান তোরেসের সুযোগ, ওয়ারজাবালের হেড, লাপোর্তের চেষ্টা, কুকুরেয়ার নিচু হেড—প্রতিবারই তিনি স্পেনের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু ভোজিনিয়ার বীরত্ব সম্ভব হয়েছে কারণ তাঁর সামনে থাকা দলটি নিজেদের পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুত হয়নি।

এই ম্যাচে স্পেনের হতাশা ছিল পরিষ্কার। তারা বল ঘুরিয়েছে, পাস দিয়েছে, প্রান্ত বদলেছে, লামিনে ইয়ামালকে নামিয়েছে, দানি ওলমোকে নামিয়েছে, নিকো উইলিয়ামসকেও ব্যবহার করেছে। কিন্তু কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ ভাঙতে পারেনি। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে আক্রমণকারী দল ফাউল আদায় করে স্থির বলে আক্রমণ থেকে পথ খোঁজে। স্পেন সেটিও করতে পারেনি।

কেপ ভার্দের জন্য এই ড্র ছিল জয়ের সমান। প্রথম বিশ্বকাপ, প্রথম ম্যাচ, সামনে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। অনেকেই ভেবেছিল, অভিজ্ঞতার অভাব ও মানের ব্যবধান তাদের বিপদে ফেলবে। কিন্তু তারা দেখিয়ে দিল, ছোট দলও বড় মঞ্চে বুদ্ধি, সংগঠন ও ধৈর্য দিয়ে ম্যাচ বদলে দিতে পারে।

স্পেনকে রুখে রাতারাতি ইনস্টাগ্রাম তারকা ভোজিনিয়া
এক ফাউলের রেকর্ড তাই কেপ ভার্দের ফুটবল-দর্শনের প্রতীক হয়ে থাকবে। তারা আক্রমণাত্মকভাবে প্রতিপক্ষকে ধাক্কা দেয়নি, ভেঙে ফেলেনি, সময় নষ্টের নাটকেও যায়নি। বরং তারা প্রতিটি পজিশন ধরে রেখেছে, লাইন কমপ্যাক্ট রেখেছে, পাসের পথ বন্ধ করেছে এবং গোলরক্ষকের সামনে যতটা সম্ভব পরিষ্কার জায়গা কমিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বকাপের সম্প্রসারিত ৪৮ দলের সংস্করণ নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল। ছোট দলগুলো কি বড় দলের বিপক্ষে টিকতে পারবে? মান কমে যাবে কি? কেপ ভার্দের এই ম্যাচ তার শক্তিশালী উত্তরগুলোর একটি। তারা শুধু টিকেনি, বরং স্পেনের মতো দলকে এমনভাবে রুখেছে, যা সংখ্যাতেও রেকর্ড হয়ে গেছে।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

পূর্বের নিউজ দেখুন

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

আজকের সর্বশেষ সংবাদ