আজ : বুধবার ║ ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : বুধবার ║ ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ║ ১২ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

২৯ এপ্রিল প্রকৃতির আঘাত

আবদুল্লাহ মজুমদার

২৯ এপ্রিল ১৯৯১—বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক কালরাত্রি, যা আজও উপকূলের বাতাসে ফিসফিস করে ফিরে আসে। সমুদ্র আর স্থলের সীমারেখা মুছে দেওয়া সেই ভয়াল মুহূর্তে প্রকৃতি যেন রুদ্ররূপে নেমে এসেছিল মানুষের জীবনের ওপর। ১৯৯১ খৃস্টাব্দে বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় কেবল একটি ঘূর্ণিঝড় ছিল না; এটি ছিল এক নিঃশব্দ মহাপ্রলয়, যেখানে ঘর ভেঙেছে, স্বপ্ন ভেসেছে, আর অসহায় মানবজীবন প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য শক্তির সামনে নতজানু হয়ে পড়েছিল। সেই রাত উপকূলকে শুধু ধ্বংসই করেনি, রেখে গেছে এক গভীর ক্ষত—যা আজও স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে, আর শিক্ষা হয়ে জেগে আছে রাষ্ট্রচিন্তায়।

সেই রাতে বঙ্গোপসাগরে জন্ম নেওয়া সুপার সাইক্লোনটি চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালীসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। ঘণ্টায় প্রায় ২২৫–২৫০ কিলোমিটার বেগে ধাবিত বাতাস এবং ১৫–২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস মুহূর্তেই গ্রাস করে নেয় ঘরবাড়ি, জনপদ ও জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় ১ কোটি মানুষ, এবং লক্ষাধিক পরিবার হয়ে পড়ে আশ্রয়হীন। ৩০ লাখেরও বেশি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়, কৃষিজমি লবণাক্ত পানিতে তলিয়ে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যসংকট সৃষ্টি করে, এবং কয়েক লাখ গবাদিপশু মারা যায়—যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে গভীরভাবে আঘাত করে।

এই বিপর্যয়ের গভীরতা বোঝাতে শুধু সংখ্যাই যথেষ্ট নয়; এর পেছনে থাকা বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তখন উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল সীমিত, আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানোর মাধ্যম ছিল দুর্বল, এবং জনসচেতনতা ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে অনেক মানুষ সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও নিরাপদ স্থানে যেতে পারেনি। উপরন্তু, ঘূর্ণিঝড়টি রাতে আঘাত হানায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে—অন্ধকারে, আতঙ্কে এবং দিশেহারা অবস্থায় মানুষের প্রাণ বাঁচানোর সুযোগ কমে যায়।

ভৌগোলিক কারণও এই ধ্বংসযজ্ঞকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ফানেল আকৃতির হওয়ায় বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাস স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতায় উঠে স্থলভাগে প্রবেশ করে। ফলে যে পানি হয়তো সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারত, সেটিই গ্রাম, বাজার ও জনপদকে এক নিমেষে ডুবিয়ে দেয়।

তবে এই বিপর্যয়ের মধ্যেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি স্থাপিত হয়। রাষ্ট্র উপলব্ধি করে যে দুর্যোগ কেবল প্রকৃতির ঘটনা নয়, বরং এটি একটি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ। এর পরই শুরু হয় ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় কাঠামোগত পরিবর্তন। উপকূলজুড়ে নির্মিত হতে থাকে হাজার হাজার আশ্রয়কেন্দ্র, আধুনিকায়ন করা হয় পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, এবং গড়ে ওঠে শক্তিশালী স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক।

এই প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে Cyclone Preparedness Programme (CPP), যা গ্রাম পর্যায়ে গিয়ে মানুষকে সতর্ক করা, সরিয়ে নেওয়া এবং দুর্যোগকালীন সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট তথ্য এবং মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে আগাম সতর্কতা এখন অনেক দ্রুত ও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

এর ফলও দৃশ্যমান। পরবর্তী বড় ঘূর্ণিঝড়গুলো—যেমন ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ঘূর্ণিঝড় আম্পান—তীব্রতা সত্ত্বেও তুলনামূলকভাবে কম প্রাণহানি ঘটিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, দুর্যোগের শক্তি নয়, বরং প্রস্তুতির শক্তিই শেষ পর্যন্ত জীবন রক্ষা করে।

তবু ১৯৯১ খৃস্টাব্দের সেই ভয়াবহতা আমাদের জন্য এখনো একটি প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত? জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে ঘূর্ণিঝড় আরও অনিশ্চিত, আরও ঘন ঘন এবং আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। উপকূলীয় জনসংখ্যা বাড়ছে, ঝুঁকিও বাড়ছে বহুগুণে। তাই শুধু অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আরও গভীর বাস্তবায়ন।

২৯ এপ্রিল তাই কেবল অতীতের একটি দিন নয়; এটি একটি নীরব শিক্ষা। এটি মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি অপরাজেয়, কিন্তু মানুষের প্রস্তুতি সেই বিপর্যয়ের অভিঘাত কমাতে পারে। ইতিহাসের এই প্রলয় আমাদের শিখিয়েছে, অবহেলা নয়, প্রস্তুতিই হতে পারে জীবন রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল।

লেখক: মহাসচিব, ট্রাস্ট অব হিউম্যান রাইটস্ বাংলাদেশ।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

আজকের সর্বশেষ সংবাদ