
সাদিয়া আফরিন
চৈত্র মাসের দমকা হাওয়ায় সুপ্ত থাকে বৈশাখের অস্তিত্ব। তখন বসন্তের সৌন্দর্য একটু একটু ক্ষীণ হতে থাকে। কচি পাতা গুলো গাঢ় সবুজ রঙ ধারণ করতে থাকে। আকাশ মাঝেমধ্যে গর্জন দিতে শুরু করে। একসময় প্রচণ্ড গর্জনে, তীব্র ঝড়ো হাওয়া দিয়ে প্রকৃতির মাঝে বৈশাখ এসে হাজির হয়।। ঠিক সেদিন বাঙালি বৈশাখকে বরণ করার নানা আয়েজন করে থাকেন।
মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই বৈশাখের ১ম দিনটি একটি বিশেষ দিন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। যা আসলে কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। কৃষকদের একসময় হিজরি চন্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী খাজনা আদায় করতে অসুবিধা হয়ে পড়ত, যা আসলে তাঁদের ফসল আদায়ের সময়ের সাথে মিলতনা। সম্রাট আকবর এই অসুবিধা দূরীকরণে বাংলা সন চালু করেন, যাতে কৃষকদের খাজনা আদায়ে কোন সমস্যা না হয়।
আর এদিকে ব্যবসায়ীরা সেদিনের আগের দিন অর্থাৎ চৈত্রের শেষ দিন তাঁদের ব্যবসার পুরনো খাতা বন্ধ করে, বৈশাখের ১ম দিন নতুন খাতা খোলেন, যা হালখাতা নামে পরিচিত। সেদিন ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করান। এর মাধ্যমে ক্রেতা – বিক্রেতাদের মাঝে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পরবর্তীতে সেই দিনটি সমগ্র বাঙালীদের কাছে একটি উৎসবমুখর দিন তথা “পহেলা বৈশাখ” হিসেবে পালন হয়ে আসছে। এই দিন কে ঘিরে গড়ে উঠে মেলা,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,মঙল শোভাযাত্রা ইত্যাদি।
কবি,সাহিত্যিকদের কাছেও পহেলা বৈশাখ বিশেষ আঙ্গিকে প্রকাশ পেয়েছেন।
কবিগুরু বৈশাখকে আহবান করেছেন এভাবে,
“এসো,এসো এসো হে বৈশাখ
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।
মুছে যাক গ্লানি,ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা”।
এ সময়ে প্রকৃতিতেও আসে ভিন্ন রূপ।
প্রকৃতির মাঝে চলে রোদ,মেঘ- বৃষ্টির লুকোচুরি খেলা। বসন্তের স্নিগ্ধ প্রকৃতি ধীরেধীরে উষ্ণ হতে থাকে। চারদিকে বহে তীব্র ঝড়ো হাওয়া। এই তীব্রতা এতই ব্যাপক যে কুড়েঘর থেকে শুরু করে মাজারি আকারের টিনের ঘরগুলো ও এর তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়না।
এর মাঝে দেখা মিলে আমগাছে আমের মুকুল। হাওয়ায় ছড়ায় আমের মুকুলের সুগন্ধ। শুধু তাই নয় এই মাস থেকেই কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ, বাঙ্গির মতো সুস্বাদ ফলেরও আমেজ শুরু হতে থাকে। তাই ফল চাষীদের এবং ফল বিক্রেতাদের চোখ- মুখ খুশিতে ভরে ওঠে। তাঁদেরও ব্যবসা লাভের সুবর্ণ সময়।
বৈশাখের প্রভাব যেন এখানেই শেষ নয়। ধীরেধীরে বাড়তে থাকে তাপের স্বাভাবিক মাত্রা। গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক জীবনযাপনে নানারকম সমস্যা সৃষ্টি হয়। মানুষ অসুস্থ হয়ে উঠে,দৈনন্দিন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। মানুষ একটু স্বস্তির আশায়,একটু ঠাণ্ডার আশায় যেন পাগল হয়ে উঠে। তাইতো বড় গাছের নিচে,বিভিন্ন পার্কে দিন-মজুর কিংবা পথচারীর ঠাঁই হয় । এই তাপদাহকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে রাস্তায় রাস্তায় অস্বাস্থ্যকর পানীয়ের টংয়ের দেকান।যা খেয়ে মানুষ আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে।
রন্ধনেও বৈশাখের আয়োজন চোখে পড়ে।বাড়িতে বাড়িতে চলে আচার তৈরির ধুৃম।কাঁচা আমের বিভিন্ন রেসিপি তৈরি করা হয়।যেমন: কেউ শরবত বানায়,কেউবা করে ভর্তা,কেউ আবার পোড়া আমের ঝোল বানায়।কেউবা করে ঘন ডালের সাথে কাঁচা আমের “আম-ডাল “তরকারি। এই ঋতু প্রকৃতিকে করে তোলে একদম খাদ্য ভাণ্ডার হিসেবে। অধিকাংশ গাছ থাকে ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ । তীব্র তাপদাহে কৃষ্ণচূড়ার রক্তলাল বর্ণ প্রকৃতিকে করে তোলে আরো সুশোভিত।
তাইতো গানে গানে কৃষ্ণচূড়ার প্রকাশ হয়েছে,
“কৃষ্ণচূড়া লাল হয়েছে ফুলে ফুলে
তুমি আসবে বলে।”
“দুচোখে কৃষ্ণচূড়ার আবীর ঢেলে
না বলে মনের কথা জানিয়ে গেলে।”
কৃষ্ণচূড়া শুধু সৌন্দর্য ছড়ায়না,মানব মনে প্রেমেরও উদ্রেক জন্মায়।
বৈশাখ কখনো তপ্ত খরায়, কখনো ঝড়ো হাওয়ায়,কখনো সুস্বাদ ফলের আমেজে আবার কখনো নববর্ষের উৎসবে বাঙালির এক –চিরচেনা অগ্নিঝরা ঋতু ।
শিক্ষক















