আজ : শনিবার ║ ২রা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

আজ : শনিবার ║ ২রা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ║১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ║ ২১শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ক‌রোনা ম্যা‌নেজ‌মেন্ট সেল শুনিয়েছেন দাহকা‌লের বৃ‌ষ্টির গল্প

ই‌ঞ্জিঃ মোঃ জা‌বেদ আবছার চৌধুরী

নতুন করোনাভাইরাস বা কোভিড – ১৯ আক্রান্ত প্রথম ব্যক্তিটি কে? তাকে বলা হয় ‘পেশেন্ট জিরো’ – এবং নিংসন্দেহে তিনিই চলমান এই করোনাভাইরাস সংক্রমণের উৎস। কিন্তু কে তিনি – চীনের কর্তৃপক্ষ আর বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে একমত নন। তাকে চিহ্নিত করতে অনুসন্ধান এখনো চলছে।

বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। বাংলাদেশে গত বছর ৮ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের ঘোষণা আসে। করোনা আতঙ্কে রাতের ঘুম উড়েছে হাজার হাজার গবেষকের। তাবড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির প্রশাসকদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে পড়েছে। সকলেই ভাবছেন, কীভাবে রোখা যেতে পারে এই মরণ ভাইরাসকে? উত্তরটা এখনও বাকি বিশ্বের গ‌বেষ‌কের কা‌ছে। এরপরও সংক্রমন ব্য‌ধির লক্ষণ পর্যা‌লোচনায় বি‌ভিন্ন প্র‌তিষ্টান টিকা তৈরী কর‌ছে যা বি‌শ্বে এখন প্র‌য়োগ চল‌ছে। চি‌কিৎসা ক্ষে‌ত্রে শতভাগ সফল কেউ দাবী কর‌তে না পর‌লেও সনাক্ত বি‌বেচনায় সুস্থতার হার বে‌শি।

চট্টগ্রা‌মে প্রথম ক‌রোনা রোগী সনাক্ত হয় গত বছ‌রের ৮ এ‌প্রিল। এরপর সারা বি‌শ্বের ন্যায় বাংলা‌দে‌শে স্বাস্থ্য‌ সেবা সংক‌টে প‌ড়ে। সরকারী হাসপাতা‌লের শয্যা সংক‌টে বিনা চি‌কিৎসায় ক‌রোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু ঘটনাও ঘ‌টে। করোনায় কাঁপ‌ছে বিশ্ব এমতাবস্থায় শ্বাস নি‌তে চাই চট্টগ্রাম। স্বাস্থ্য‌সেবা এমন ক‌ঠিন সংক‌টের সময় এ‌গি‌য়ে আ‌সে বেসরকারী স্বেচ্ছা‌সে‌বী মান‌বিক হাসপাতাল হিসা‌বে চট্টগ্রামের আগ্রবাদ মা ও শিশু হাসপাতাল।

হাসপাতা‌লের প‌রিচালনা প‌রিষ‌দের ৪৫৩ তম সভায় চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতা‌লের ক‌রোনা রোগীর চি‌কিৎসা সেবা প্রদা‌নের জন্য এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়। ওই দিন হাসপাতালের প‌রিচালনা প‌রিষ‌দের ট্রেজারার আলহাজ্ব রেজাউল করিম আজাদের দুঃসাহ‌সিক প্রস্তাবনায়, প‌রিচালনা প‌রিষ‌দের একজন দাতা সদস্য হিসা‌বে দেশ ও জা‌তির ক্রা‌ন্তিল‌গ্নে চি‌কিৎসা সেবার কথা চিন্তা ক‌রে সর্বপ্রথম উক্ত প্রস্তা‌বে আ‌মি সমর্থন ক‌রি। প্রাথমিক ভা‌বে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়। ক‌রোনা আক্রান্ত রোগী‌দের ভ্যা‌ন্টি‌লেটর সু‌বিধা সহ “ক‌রোনা ইউ‌নিট ” চালুর জন্য সভায় সকল আজীবন সদস্য, সমাজ হি‌তৈ‌ষী ব্য‌ক্তি বর্গ থে‌কে আ‌র্থিক সহ‌যোগীতা সংগ্র‌হের মাধ্য‌মে ১ কো‌টি ৪৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা বা‌জেট নির্ধারন করা হয়। চালু করা হয় ক‌রোনা ওয়ার্ড ও নমুনা প‌রিক্ষা কেন্দ্র। প্রায় ৯২ লাখ টাকার ব্য‌য়ে হাসপাতা‌লে স্থাপন করা হয় আর‌টি-‌পি‌সিআর ল্যাব।

গত বছ‌র করোনার প্রাথমিক পর্যায়ে হাসপাতা‌লের নতুন ভব‌নের একাংশে ২য়- ৩য় তলায় ৩৪ শয্যা বেড নি‌য়ে শুরু করা হয় ক‌রোনা রোগী‌দের চি‌কিৎসা সেবা। বাংলা‌দেশ সরকা‌রের তথ্য মন্ত্রী হাসান মাহমুদ এম‌পি ভার্চুয়ালী আনুষ্টা‌নিক ভা‌বে এই ‌সেবা চালু ক‌রেন এতে আরও সংযুক্ত ছি‌লেন ভূ‌মি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জা‌বেদ, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যা‌রিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নও‌ফেল ও সা‌বেক চ‌সিক মেয়র আ, জ, ম না‌ছির উ‌দ্দিন।
এই যাত্রা ছিল নগরবাসীর কা‌ছে দাহকা‌লে এক পশলা বৃ‌ষ্টি। চি‌কিৎসা ক্ষে‌ত্রে আশহ‌তের মানু‌ষের বিপরী‌তে আশার মশাল জ্বা‌লি‌য়ে‌ আস্থার শেক‌ড়ে পৌঁ‌ছে‌ছে চট্টগ্রাম আগবাদ মা ও শিশু
– হাসপাতাল। স্থাপন করা হয় ” ক‌রোনা ইউ‌নি‌টে” সেন্ট্রাল অ‌ক্সি‌জেন লাইন। পরব‌র্তি‌তে শয্যা সংখ্যা ৬০ টি উন্নতী‌ করা হয়। ক্রমাগত রোগী বৃ‌দ্ধি পাওয়া‌তে আজ পর্যায়ক্র‌মে ক‌রোনা ওয়ার্ড‌কে ১৫০ শয্যা রুপান্ত‌রিত করা হয়। রোগীর বেগ সামলা‌তে না পে‌রে সেই সময়ে হাসপাতা‌লের পুরাতন ভবনের ২য় -৪র্থ তলার সব কে‌বিন এবং হাসপাতা‌লের আই‌সিইউ ও এইচ‌ডিইউ সম্পূর্ণ রূপে ক‌রোনা রোগী‌দের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। ক‌রোনা ইউ‌নিটের জন্য ডাক্তার ও নার্স সহ সেবা সং‌শ্লিষ্ট সর্বস্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে জনবল নি‌য়োগ দেওয়া হয় আ‌লেদা ভা‌বে।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদের করোনা যোদ্ধা বৃন্দ, ডাক্তার, নার্স, কমকর্তা ও কর্মচারী‌দের অক্লান্ত প‌রিশ্র‌মের ফসল আজ এই ” ক‌রোনা ইউ‌নিট “। অত্যান্ত দৃঢ় চি‌ত্তে ম‌নে দায়িত্বরত প্র‌ত্যে‌কে নি‌জের জীবন‌কে বা‌জি রে‌খে প্রাণ পণ সংগ্রাম ক‌রে এখনো পর্যন্ত চি‌কিৎসা সেবা চা‌লি‌য়ে যাচ্ছে। যার ফ‌লে সমগ্র বাংলা‌দে‌শে বর্তমান চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতা‌ল ক‌রোনা রোগী‌দের জন্য ভরসাস্থল হ‌য়ে দাঁ‌ড়ি‌য়ে‌ছে। বিগত এক বছ‌রের আমাদের হাসপাতা‌লের এক ঝাঁক ডাক্তার, নার্স‌ ও কর্মচারীদের সমন্ব‌য়ে এ পর্যন্ত ৪১০৯ জন ক‌রোনা রোগী‌কে সেবা দেওয়া হ‌য়ে‌ছে , যার ম‌ধ্যে সুস্থ্য হ‌য়ে বা‌ড়ি ফির‌ছেন ৩৬৫৩ জন আর মারা গে‌ছেন ৩৭৮ জন।

এ যাবৎ উক্ত আর‌টি-‌পি‌সিআর ল্যা‌বে ৬১০০ জ‌নের কো‌ভিট টেস্ট করা হয় । ক‌রোনা চি‌কিৎসা সেবার শুরুর দি‌কে চট্টগ্রা‌মে কা‌রোও কা‌ছে হাই ফ্লো ন্যাজল ক্যানুলা ছিলনা শুধু মাত্র চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতা‌লের এক‌টি হাই ফ্লো ন্যাজল ক্যানুলা ছিল। এক‌টি হাই ফ্লো ন্যাজল ক্যানুলা দি‌য়ে সর্ব প্রথম আমরা এই দুঃসাহ‌সিক পদযাত্রা শুরু ক‌রে‌ছিলাম কিন্তু বর্তমা‌নে ৫০টি অধীক হাই ফ্লো ন্যাজল ক্যানুলা দি‌য়ে মহামারী ক‌রোনা চি‌কিৎসা সেবা অব্যাহত র‌য়ে‌ছে।

ই‌তিম‌ধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আমা‌দের‌কে বি‌দেশগামী যাত্রী‌দের ক‌রোনা টে‌স্টের জন্য অনু‌মোদন প্রদান ক‌রে‌ছেন। যা বেসরকারী হাসপাতা‌লে এক‌টি নব‌দিগন্ত সূচনা উ‌ম্মে‌চিত হ‌লো। বর্তমা‌নে “ক‌রোনা ইউ‌নি‌টে” মেডিসিন বিভাগের তত্ত্বাবধানে চি‌কিৎসা সেবা ক্ষে‌ত্রে জ‌ড়িত র‌য়ে‌ছেন ৩২ জন ডাক্তার, ৩৮ জন নার্স সহ ৫২ জন অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা ক‌র্মি।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের করোনা চি‌কিৎসা সেবা পার কর‌ছে এক বছর। নানান স্মৃ‌তি বিজ‌ড়িত অ‌নেক গ‌ল্পের সমাহার করোনা ম্যা‌নেজ‌মেন্ট সেল।

বি‌শেষ ক‌রে হাসপাতা‌লের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আলহাজ্ব এস এম মোর্শেদ হোসেনের বিচক্ষণতার মাধ্য‌মে সর্বমোট ১২ জন অকুতোভয় সমাজসেবক এবং করোনা যোদ্ধাদের নেতৃত্বে গঠিত হয় করোনা ম্যানেজমেন্ট সেল এবং নিবেদিত প্রাণ ডাক্তার নার্স‌দের সমন্বয়ে গ‌ঠিত হয় করোনা ট্রিটম্যান্ট সেল। ওই‌দিন আমা‌দের এই মহৎ কা‌জে নাম না জানা সমা‌জ হি‌তৈষি অ‌নেক ব্য‌ক্তি‌দের সাহায্যের অবদান অন‌ষিকার্য। ম‌নের ম‌ন্দি‌রে সেই দি‌নের দূর্লভ কিছু স্মৃ‌তি বারবার মন আনচাল ক‌রে।

গত বছ‌রের ৮ জুন সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত হাসপাতালে কর্তব্য পালনে ও মানবিক দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত আমরা। এক সাথে অনেক করোনা রোগী এসে যাওয়ায় আমরা হিমশিম খাচ্ছিলাম ওয়ার্ডে রোগী পৌঁছাতে ও ট্রিটম্যান্টের আওতায় আনতে। এক পর্যায়ে আমি নিজে লিফটম্যা‌নের ও ওয়ার্ডবয়ের ভূ‌মিকায় ছিলাম, রোগীদের উপরে তুলছি আর বেডে নি‌য়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সহ নানান কা‌জে লিপ্ত। ভূলে গি‌য়েছিলাম করোনার নিয়ম কানুন। ই‌তিম‌ধ্যে ক‌রোনা চি‌কিৎসা সেবা নি‌শ্চিত কর‌তে গি‌য়ে আমরা হারালাম হাসপাতাল পরিচালনা পরিষদের করোনা যোদ্ধা ইঞ্জি: মো: আলী আশরাফ এবং চিকিৎসকদের মধ্য থেকে ডা: জাফর হোসেন রুমী ও ডা: লতিফা জামান আইরিনকে। আল্লাহ উনাদের বেহেস্ত নসীব করুক, আমিন। এই কঠিন পরিস্তিতিতে যারা মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, চিকিৎসা দিয়েছেন ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয়, আয়া, ক্লিনার ও হাসপাতালের ষ্টাফ সকলকে স্যালুট জানাই।

সকলের প্রতি শুভ কামনা। উ‌ল্লেখ্য ১৯৭৯ সা‌লের ৩১ ডি‌সেম্বর আর্ন্তজা‌তিক শিশু বর্ষ উপল‌ক্ষে চট্টগ্রা‌মের কিছু মহৎ প্রাণ নিবেদিত সমাজ সেবক ব্য‌ক্তিদের ঐকা‌ন্তিক প্র‌চেষ্টায় এই হাসপাতাল প্র‌তিষ্টা লাভ ক‌রে। শুরুর দি‌কে শিশু স্বাস্থ্য ব‌র্হি‌বিভাগের মাধ্য‌মে এই হাসপাতা‌লের যাত্রা শুরু কর‌লেও এ‌টি এখন সমগ্র বাংলা‌দে‌শে মান‌বিক সেবাদানকারী এক‌টি বিশাল প্র‌তিষ্টা‌ন হিসা‌বে প‌রিনত হ‌য়ে‌ছে। এই প্র‌তিষ্টা‌নের অ‌ধী‌নে বর্তমান সুপ‌রি‌চিত বেসরকারী মে‌ডি‌কেল ক‌লেজ, না‌র্সিং ট্রে‌নিং ইন‌স্টি‌টিউট, না‌র্সিং ক‌লেজ, ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ‌টিজম ও শিশু বিকাশ‌ কেন্দ্র সহ ৮০০ শয্যা বি‌শিষ্ট এক‌টি জেনা‌রেল হাসপাতাল হিসা‌বে পূর্ণাঙ্গ চি‌কিৎসা সেবা সফল ভা‌বে প‌রিচা‌লিত হ‌চ্ছে।

হাসপাতালটিতে এবার নতুন যোগ হচ্ছে সিঙ্গাপুর ও ব্যাংক‌কের আদ‌লে ৫০ শয্যার আন্তর্জাতিক মানের কার্ডিয়াক সার্জারি ইউনিট, যা নব -নির্মিত ১৮তলা ভবনের ষষ্ঠ তলায় অত্যাধুনিক পূর্ণাঙ্গ কার্ডিয়াক সার্জারি ইউনিট হিসা‌বে চালু করা হবে। পৃ‌থি‌বির সকল ধর্ম ও ব‌র্ণের মানুষ ক‌রোনার এই করাল গ্রাস থে‌কে মু‌ক্তি পাক এবং দূর হউক সকল কা‌লিমা, সে প্রত্যাশায়।

‌লেখকঃ ইঞ্জি: মো: জা‌বেদ আবছার চৌধুরী
দাতা সদস্য, হাসপাতাল পরিচালনা পরিষদ এবং
ভাইস চেয়ারম্যান, ক‌রোনা ম্যা‌নেজ‌মেন্ট সেল।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

আজকের সর্বশেষ সংবাদ