আজ : মঙ্গলবার ║ ৩১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : মঙ্গলবার ║ ৩১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║১৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ║ ১২ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

শরিফুল ইসলাম অনিক-এর “দূরত্বের নীল দিনগুলো” প্রেম-বিরহ ও ব্যক্তিগত অনভুতির দলিল

অভিলাষ মাহমুদ

কবিতা হলো আত্মার ভাষা, যা কখনো দহনে পুড়ে আর কখনো প্রাপ্তির আনন্দে ঝরে পড়ে। তরুণ কবি শরিফুল ইসলাম অনিক-এর সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘দূরত্বের নীল দিনগুলো’ তেমনই এক অনুভবের দলিলে ঠাসা সংকলন। ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় ‘বইমই প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি প্রথম নজরেই পাঠকের মনে এক স্নিগ্ধ বিষণ্নতার আবহ তৈরি করে। এর প্রতিটি ছত্রে যেমন আছে জীবনকে ফিরে দেখার আর্তি, তেমনি আছে স্রষ্টার চরণে নিজেকে সপে দেওয়ার এক আধ্যাত্মিক সুবাস।

​প্রচ্ছদ ও নামকরণের তাৎপর্য : শামসুর রহমান’র করা প্রচ্ছদটি বইয়ের নামকরণের সাথে এক অপূর্ব সামঞ্জস্য তৈরি করেছে। একজোড়া বিচ্ছিন্ন অবয়ব এবং মাঝখানে দিকনির্দেশক সাইনবোর্ড—সব মিলিয়ে এক গভীর শূন্যতা আর অপেক্ষার গল্প বলে। ‘নীল’ রঙটি এখানে কেবল বিষণ্নতা নয়, বরং এক বিশালত্বের প্রতীক। দূরত্ব যখন নক্ষত্রের মতো দীর্ঘ হয়, তখন তা কেমন নীল হয়ে ধরা দেয়, সেই অনুভবেরই কাব্যিক রূপান্তর এই নামকরণ।
​কাব্যগ্রন্থের মূল সুর ও বিষয়বৈচিত্র‍্য :-
​১. স্রষ্টার প্রতি পরম সমর্পণ : শরিফুল ইসলাম অনিকের কবিতায় আধ্যাত্মিকতা কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং তা এক একান্ত নির্ভরতা। ‘সালাত’ কবিতায় তিনি যখন বলেন— “আমি দিগ্ভ্রান্ত, পথ খুঁজে পাই না/ তাই আমি সালাতে দাঁড়াই”, তখন তা আর কেবল ধর্মীয় আচার থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে এক দিশাহারা আত্মার শান্তির আশ্রয়। ‘আল্লাহকে বলি’ বা ‘আমলনামা’ কবিতায় কবি নিজের ভুল আর ক্ষুদ্রতাকে স্বীকার করে স্রষ্টার রহমতের চাদরে আশ্রয় চেয়েছেন। পরকালের অমোঘ সত্য আর আমলনামার ভাবনা তাঁর কবিতায় এক গভীর জীবনদর্শন যোগ করেছে।
​২. বিরহ, একাকীত্ব ও নীল দহন : বইটির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সম্পর্কের টানাপোড়েন আর একাকীত্ব। ‘দূরত্ব’ কবিতায় কবি বলছেন— “তোমার শ্রাবণ দূরত্ব আমাকে সেভাবে পোড়ায়/ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে আমাকে অঙ্গার করেছে তিলে তিলে।” এখানে দূরত্বকে কবি শ্রাবণের বৃষ্টির সাথে নয়, বরং আগুনের সাথে তুলনা করেছেন, যা এক অভিনব চিত্রকল্প। আবার ‘পাশাপাশি’ কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন— “দূর থেকেও পাশাপাশি” থাকা যায়, যদি ভালোবাসা হয় মৃত্যুর থেকেও কাছাকাছি। এই বিরহ বোধটিই বইটির নামের সার্থকতা ফুটিয়ে তোলে।
​৩. মাতৃবন্দনা ও স্মৃতিকাতরতা : মায়ের প্রতি কবির ভালোবাসা এবং তাঁর চরণে সমর্পণ এই গ্রন্থের অন্যতম আবেগী দিক। ‘মায়ের সাথে আমার অনেক অভিমান’ কবিতায় কবি তাঁর শৈশবে ফিরে গেছেন। মা যেখানে কেবল জন্মদাত্রী নন, বরং খেলার সাথী এবং জীবনের প্রথম শব্দ। শীতের রাতের উষ্ণতা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি কাজে মায়ের ছায়া খুঁজে পাওয়া—এই চিরন্তন সত্যটি কবি অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
​৪. সমাজচেতনা ও দেশপ্রেম : ব্যক্তিগত আবেগের বাইরেও কবি তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা ভুলে যাননি। ‘স্বাধীন দেশ’ কবিতায় তিনি মুক্ত বাতাসের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং হায়েনার থাবা থেকে দেশকে মুক্ত করা তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আবার ‘সময়ের টান’ কবিতায় মানুষের স্বার্থপরতা আর বদলে যাওয়া রূপকে তুলে ধরে এক প্রকার সামাজিক বার্তা দিয়েছেন।
​৫. জীবনের দর্শন ও অপ্রাপ্তি : ‘রাতের দেওয়াল’ কবিতাটি এই সংকলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। রাতের নীল আকাশে তারা গুনতে গুনতে কবি যখন জীবনের হিসাব মেলান, তখন তাঁর প্রাপ্তি বা হতাশা ছাপিয়ে এক গভীর শুকরিয়া প্রকাশ পায়। অন্যের দুঃখ দেখে নিজের ভালো থাকাকে উপলব্ধি করা—এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পাঠককে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
​শিল্পগুণ ও শব্দচয়ন : অনিকের কবিতার প্রধান শক্তি হলো এর সরলতা। তিনি কোনো কঠিন শব্দ বা জটিল অলঙ্কারের আশ্রয় নেননি। তার উপমাগুলো আমাদের প্রতিদিনের পরিচিত জগত থেকে নেওয়া। ‘দুই কাপ চা’, ‘দক্ষিণা বাতাস’, ‘জ্বলন্ত মোম’ বা ‘ভোরের শিশির’—এই সাধারণ বিষয়গুলোই তাঁর কবিতায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হয়, এটি কেবল কবির কথা নয়, বরং আমার-আপনার জীবনের গল্প।
​সমাপ্তি ও মূল্যায়ন : পরিশেষে বলা যায়, ‘দূরত্বের নীল দিনগুলো’ কেবল কতগুলো শব্দের সমাহার নয়, এটি এক দগ্ধ হৃদয়ের প্রশান্তির খোঁজ। শরিফুল ইসলাম অনিক তাঁর সহজ সাবলীল লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের এক নীল বেদনার রাজ্যে নিয়ে গেছেন, যেখানে পৌঁছানোর পর আর ফিরতে ইচ্ছে করে না। প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির দ্বন্দ্বে দুলতে থাকা মানুষের জন্য এই বইটি এক দারুণ সান্ত্বনা হতে পারে। তরুণ এই কবির হাত ধরে বাংলা কবিতায় নতুন এক প্রাণের সঞ্চার হোক। ‘দূরত্বের নীল দিনগুলো’ কেবল এই বইমেলায় নয়, পাঠকের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিক—এই শুভকামনা রইল।
​একনজরে বইয়ের তথ্য :
​বই: দূরত্বের নীল দিনগুলো
​লেখক: শরিফুল ইসলাম অনিক
​প্রকাশক: ইমদাদুল হক (বইমই প্রকাশনী)
​প্রচ্ছদ: শামসুর রহমান
​উৎসর্গ: মরহুম মোঃ ফজলুর রহমান (বড় মামা)
​প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও গল্পকার

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

আজকের সর্বশেষ সংবাদ