
আবদুল্লাহ মজুমদার
একটি ছোটকাগজ হাতে নেওয়া মানে শুধু কয়েকটি মুদ্রিত পৃষ্ঠা উল্টে দেখা নয়; কখনো কখনো তা যেন সময়ের একটি গোপন দরজা খুলে দেওয়া। মলাটের ভেতর জমে থাকে কিছু মানুষের স্বপ্ন, নিরলস শ্রম আর সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। মূলধারার কোলাহলের বাইরে লিটলম্যাগ তার নিজস্ব স্বরে কথা বলে—কখনো নিভৃতে, কখনো তীক্ষ্ণ উচ্চারণে। সেখানে সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত পথের পাশাপাশি তৈরি হয় নতুন পায়ের চিহ্ন। সেই ধারারই একটি নিবেদিত আয়োজন গল্পবিষয়ক লিটলম্যাগ ‘প্রকাশ’। বর্ষ ২২, সংখ্যা ৯, প্রকাশকাল জুন ২০২৫। তার স্লোগান—‘বর্ণের উৎসবে সৃষ্টির উচ্ছ্বাস’। স্লোগানটি যেন শুধু একটি বাক্য নয়, বরং পত্রিকাটির দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রার অন্তর্গত বিশ্বাসেরই সংক্ষিপ্ত উচ্চারণ।
লিটলম্যাগের শক্তি তার ক্ষুদ্র পরিসরে নয়, তার স্বাধীন দৃষ্টিতে। বাজারের চাহিদা, প্রচলিত রুচি কিংবা প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর বাইরে ছোটকাগজ বহুদিন ধরেই বাংলা সাহিত্যের বিকল্প প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ, পরীক্ষামূলক লেখার সাহস, অবহেলিত বিষয়কে সামনে আনা কিংবা সাহিত্যের প্রচলিত পাঠকে প্রশ্ন করা—এসব ক্ষেত্রেই লিটলম্যাগের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ‘প্রকাশ’-এর এই সংখ্যাতেও সেই স্বাধীন সৃজনচেতনার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে।
গল্পের ভেতর গল্প: ‘প্রকাশ’-এর এই সংখ্যার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার বিষয়বৈচিত্র্য। প্রবন্ধ, গল্প, ‘গল্প লেখার গল্প’, অনুগল্প, ছবিগল্প, স্মরণগল্প, বই আলোচনা এবং জেলাভিত্তিক গল্পচর্চার ধারাক্রম—সব মিলিয়ে গল্পকে শুধু একটি সাহিত্যিক রূপ হিসেবে নয়, একটি বিস্তৃত সৃজন-পরিসর হিসেবে দেখার চেষ্টা রয়েছে।
প্রবন্ধে লিখেছেন বিপ্লব বিশ্বাস, মোজাম্মেল হক নিয়োগী, লাবণ্য প্রভা, মোহছেনা ঝর্ণা ও আনজীর লিটন। তাঁদের রচনার মধ্য দিয়ে গল্পের বাইরের চিন্তার জগৎটিও সংখ্যাটিতে জায়গা পেয়েছে। ফলে পাঠক শুধু গল্প পড়েন না; গল্পের সামাজিক, নান্দনিক ও মননশীল প্রেক্ষাপট নিয়েও ভাবার অবকাশ পান।
গল্পে রয়েছেন ধ্রুব এষ, বীরেন মুখার্জী, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, চন্দনকৃষ্ণ পাল ও শুভাশিস চক্রবর্তী। একাধিক লেখকের ভিন্ন ভিন্ন স্বরকে পাশাপাশি রাখার মধ্য দিয়ে সংখ্যাটি কথাসাহিত্যের বহুমাত্রিকতাকে ধারণ করেছে। গল্পের বিষয়, ভাষা ও নির্মাণভঙ্গির পার্থক্যই এখানে এক ধরনের সাহিত্যিক বৈচিত্র্য তৈরি করেছে।
গল্পের জন্মের অন্তরালে
‘গল্প লেখার গল্প’ বিভাগটি সংখ্যাটির একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। লিখেছেন মঈনুস সুলতান।
আমরা সাধারণত একটি গল্পের পরিণত রূপটিই পাঠ করি। কিন্তু একটি গল্পের জন্মের আগে থাকে কত দৃশ্য, কত স্মৃতি, কত মানুষ, কত অস্থিরতা! কোনো একটি মুহূর্ত কখন লেখকের মনে গল্পের বীজ বুনে দেয়, কীভাবে বাস্তবতা কল্পনার সঙ্গে মিশে যায়, আর কীভাবে সেই অভিজ্ঞতা ভাষার শরীর পেয়ে শিল্পে রূপ নেয়—সেই অদৃশ্য পথটিই ‘গল্প লেখার গল্প’ পাঠককে দেখার সুযোগ করে দেয়।
এখানেই এই বিভাগের সার্থকতা। গল্পের বাইরের গল্পটি জানা গেলে অনেক সময় গল্পের ভেতরের আলো-ছায়াও নতুন করে ধরা পড়ে।
অল্প শব্দে বিস্তৃত অনুরণন
অনুগল্পে জেবুননেসা হেলেন এবং ছবিগল্পে কনকচাঁপা চাকমা সংখ্যাটির আঙ্গিকগত পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে।
অনুগল্প মূলত মিতব্যয়িতার শিল্প। অল্প শব্দে একটি অনুভূতি, একটি সম্পর্ক কিংবা জীবনের কোনো গভীর সত্যকে স্পর্শ করা সহজ নয়। সেখানে প্রতিটি শব্দের আলাদা ওজন থাকে। অন্যদিকে ছবিগল্প শব্দের সঙ্গে দৃশ্যের ভাষাকে যুক্ত করে গল্প বলার ভিন্ন সম্ভাবনা তৈরি করে। এই দুই আয়োজন প্রমাণ করে, গল্পের কোনো একক শরীর নেই; সময় ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার প্রকাশরীতিও বদলে যায়।
স্মৃতির ভেতর দিয়ে সময়কে দেখা
‘স্মরণগল্প’ বিভাগে রয়েছে রতনতনু ঘোষ : শামসুজ্জামান।
স্মরণ কখনো কেবল একজন মানুষকে মনে রাখার আয়োজন নয়। ব্যক্তিগত স্মৃতির ভেতর দিয়েও একটি সময়ের সাহিত্যিক আবহ, সম্পর্কের উষ্ণতা এবং হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর ছায়া ফিরে আসে। তাই স্মরণগল্পের আবেদন শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সময়কে ধরে রাখার এক ধরনের সাহিত্যিক প্রয়াস।
বইয়ের সঙ্গে পাঠকের নতুন সাক্ষাৎ: বই আলোচনা বিভাগে রয়েছে আনিফ রুবেদের ‘দৃশ্যবিদ্ধ নরনারীগান’, আলোচনা করেছেন ইলিয়াস বাবর; এবং সুনীল রায়ের ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’, আলোচনা করেছেন মনোজিৎকুমার দাস।
একটি বই প্রকাশের পর তার দ্বিতীয় জীবন শুরু হয় পাঠকের হাতে। আর সমালোচনা সেই জীবনে যোগ করে নতুন আলো। একটি ভালো আলোচনা বইটির পরিচয় দেয়, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা—পাঠককে বইটির দিকে নতুন চোখে তাকাতে শেখায়। সেই অর্থে বই আলোচনা ‘প্রকাশ’-এর এই সংখ্যায় সাহিত্যের সঙ্গে সাহিত্যের আরেকটি সংলাপ তৈরি করেছে।
গল্পের মানচিত্রে জেলা ও জনপদ: তবে এই সংখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অনুসন্ধানী আয়োজন নিঃসন্দেহে ‘ক্রোড়পত্র : প্রথম পর্ব—জেলাভিত্তিক গল্পচর্চার ধারাক্রম’।
নড়াইল, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল, মাগুরা, শরীয়তপুর, পাবনা, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শেরপুর ও মাদারীপুর—দশটি জেলার গল্পচর্চাকে সামনে এনেছে এই ক্রোড়পত্র। লিখেছেন আফরোজা পারভীন, সৌহার্দ সিরাজ, আলী হাসান, মনোজিৎকুমার দাস, ইয়াসীন আযীয, অলোক আচার্য, কুমার অরবিন্দ, আমির হোসেন, আশরাফ আলী চারু ও সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।
এখানে ‘জেলা’ শুধু একটি প্রশাসনিক পরিচয় নয়; এটি একটি জীবনভূগোল। প্রতিটি জনপদের রয়েছে নিজস্ব ভাষার টান, লোকস্মৃতি, সামাজিক বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের ধরন। সেই অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার গল্পের শরীরে ছাপ ফেলে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঢাকা ও বড় শহরগুলোর আলো অনেক উজ্জ্বল। সেই আলোয় অনেক সময় মফস্বল ও প্রান্তের সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড আড়ালে পড়ে যায়। অথচ কোনো জেলা শহরের ছোট্ট সাহিত্যসভা, কোনো পাঠচক্র, কোনো লিটলম্যাগের পাতা কিংবা কোনো নিভৃত লেখকের টেবিলেও সাহিত্য তার নিজস্ব দীপ্তি নিয়ে জন্ম নেয়।
এই ক্রোড়পত্র সেই প্রান্তিক আলোয় চোখ ফেরানোর চেষ্টা করেছে। ফলে এর গুরুত্ব শুধু তথ্যসংগ্রহে নয়; বরং বাংলাদেশের গল্পচর্চাকে কেন্দ্রনির্ভরতার বাইরে এনে একটি বিস্তৃত সাহিত্যভূগোলের মধ্যে দেখার প্রয়াসে।
এক অর্থে, এটি বাংলাদেশের গল্পের একটি বিকল্প মানচিত্র আঁকার উদ্যোগ। সেই মানচিত্রে রাজধানীর পাশাপাশি জায়গা করে নেয় জনপদ; প্রতিষ্ঠিত নামের পাশে শোনা যায় অপেক্ষাকৃত অনুচ্চারিত কণ্ঠ; আর সাহিত্যের ইতিহাস পায় আরও বিস্তৃত পরিসর।
নির্মাণের নেপথ্যে
সম্পাদক শফিক হাসান, সহকারী সম্পাদক শায়লা জামান জয়া ও সালাম মাহমুদ-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত এই সংখ্যার নির্মাণেও রয়েছে পরিকল্পনার ছাপ। নামলিপি ধ্রুব এষ, প্রচ্ছদ শতাব্দী জাহিদ এবং মুদ্রণ তত্ত্বাবধানে অরণ্য প্রভা—তাঁদের সম্পৃক্ততা সংখ্যাটির সামগ্রিক নান্দনিকতায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
মুদ্রণ: ম্যাকয়, ১৮ নীলক্ষেত, বাবুপুরা, ঢাকা–১২০৫। মূল্য ১০০ টাকা। যোগাযোগের ঠিকানা ৪৭, আজিজ সুপার মার্কেট (নিচতলা), শাহবাগ, ঢাকা–১০০০।
একটি লিটলম্যাগের আয়তন ছোট হতে পারে, কিন্তু তার স্বপ্ন কখনো ছোট নয়। ‘প্রকাশ’-এর এই সংখ্যাটি সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। এখানে গল্প শুধু পাঠের বিষয় নয়—গল্পের জন্ম, গল্পের স্মৃতি, গল্পের আঙ্গিক, গল্পের পাঠ এবং গল্পের ভূগোল—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি বিস্তৃত সাহিত্যিক পরিসর।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে শেষ পর্যন্ত মনে হয়, গল্প আসলে কাগজের ভেতর বন্দি কোনো শব্দসমষ্টি নয়। গল্প মানুষের জীবন থেকে উঠে আসে, মাটির গন্ধ মেখে পথ চলে, স্মৃতির ভেতর আশ্রয় নেয় এবং একদিন বর্ণের শরীর পেয়ে সাহিত্যে নিজের ঠিকানা খুঁজে নেয়। ‘প্রকাশ’-এর ‘বর্ণের উৎসবে সৃষ্টির উচ্ছ্বাস’ তাই নিছক একটি স্লোগান নয়—এ যেন শব্দ, মানুষ, জনপদ ও সৃষ্টির সেই অবিরাম মেলবন্ধনের নাম। একটি ছোটকাগজের মলাট খুলে পাঠক যখন গল্পের ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন আসলে খুলে যায় আরও বড় এক দরজা—বাংলাদেশের বহুস্বরিক জীবন ও সাহিত্যের দিকে।
লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।


















