আজ : বুধবার ║ ১২ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : বুধবার ║ ১২ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║২৮শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ║ ২৯শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

‘মহাপ্লাবনের পলি’ যেন এক শিকড়মগ্নের শিল্পিত ভাস্কর্য

নাসের ভূট্টো

আধুনিক বাংলা কবিতার তুখোড় জননন্দিত মানসপ্রিয়তার জোয়ার এবং সৃষ্টিশীল নবতর কাব্য নিরীক্ষা পর্বের ভিন্নমাত্রিক কবি হিসেবে খালেদ মাহবুব মোর্শেদ এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের পুরোধা কবি ব্যক্তিত্ব। দেশ- ভাগ- পরবর্তী কবিতায় দৃশ্যমান পালাবদলে যে অল্প ক’জন কবি সৃজনশীলতার প্রমান রেখেছেন খালেদ মাহবুব মোর্শেদ সেক্ষেত্রে অন্যতম একজন কবি প্রতিভা। ‘মহাপ্লাবনের পলি’ কাব্যগ্রন্হটি বিষয়বৈচিত্রের নতুনত্বের চেয়ে এর দার্শনিক কাব্যিক তত্ত্ব প্রাগ্রসর পাঠকদের নাড়া দেয় প্রবলভাবে। কবিতা এক প্রকার মায়াবি মনোলীন শিল্পিত ভাস্কর্য। কবি তাঁর মনের আবেগ ও উপলব্ধিকে শব্দশৈলীর রেখাঙ্কনে কবিতায় ব্যঞ্জিত করেন। কাজটি খুব সহজ নয়। যে- কোন ভাষায় যে নতুনভাবে মনেরভাব প্রকাশ করা তো কবিতা নয়। ভাষাজ্ঞান থাকলে যে কেউ মনের বিচিত্রভাব প্রকাশ করতে পারে। যে কেউ যা পারে তা পারা কবিত্ব নয়। কবিকে সকলের জানা জীবন সঞ্জাত বিশেষ ভাবভাষা ও কথাকে নতুন মূল্যমানে ও আঙ্গিকে আবিস্কার করতে হয়। শব্দে, ছন্দে, উপমায়, রূপকে, চিত্রকল্পে, ভাবের শাশ্বত মূল্যমানে- ঐশ্বর্য ভাবভঙ্গিতে অনিন্দ্য সুন্দর রূপে তৈরি করতে হয় কবিতার নান্দনিক দেহ। যাকে আমরা বলি কবিতার আঙ্গিক ঐশ্বর্য। শব্দ হলো কবিতার ভিত্তি। কবিতার শব্দ মেজবানের মাংস নয়, অন্যরকম উন্নত মানের শুধুমাত্র মুখরোচক খাবারও নয়। কবিতায় ব্যবহৃত নবউত্থিত শব্দমালাকে নন্দন তাত্ত্বিকেরা অপরিহার্য কিংবা অনিবার্য শব্দ বলেন। যা না হলে ভাবের ঐশ্বর্য যথাযথ ফোটে ওঠেনা। অপরিহার্য শব্দকে কবি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি দান করে থাকে। অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হলো চতুর্মুখী ব্যঞ্জনা সমৃদ্ধ শব্দ ঝঙ্কার ও মনোহারি বিরল বাক্যবন্ধ। নিখুঁত ছন্দের সংহতি, রসের ব্যঞ্জনা, শব্দের নতুন অর্থ মূল্য, শ্লেষ ও পাঠক হৃদয়ের অনুভূতিকে চমৎকৃত করা নতুনত্বে কবি তাঁর ভাবকে রসের আস্বাদ্যমান্যতায় দারুন সমৃদ্ধ করেন। যা কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদের ‘মহাপ্লাবনের পলি’ কাব্যগ্রণ্হে আমরা পেয়ে থাকি। কবিতায় প্রাণ প্রতিষ্টার ক্ষেত্রে যথাযথ রূপকের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে। কবিতায় রূপকের প্রাধান্যকে অস্বীকার করার জো নেই। সময়কালের জিজ্ঞাসা ও অভিপ্রায়কে ব্যক্ত করার ক্ষেত্রেও কাব্যিক রূপকের ভুমিকা অতুলনীয়। যা কবির আগ্রহকে অনুবর্তী প্রতিবর্ণীকরণের ক্ষেত্রে অভাবনীয় ভুমিকা রাখে। পাশাপাশি ‘মহাপ্লাবনের পলি’ কাব্যে খালেদ মাহবুব মোর্শেদ কবি হিসেবে আবেগকে তেমন প্রশ্রয় দেননি, এমনকি যখন কবিতার বিষয় এমনি যে-সহজেই সংঘম হারিয়ে তা নুয়ে পড়ার মতো। শামসুর রহমানের মতো সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে তিনি আবেগকে ফিরিয়ে এনেছেন যৌত্তিক ভাবাবেগ এবং Melodrama- রাস্তা থেকে। ব্যঙ্গ বিদ্রুপের কঠিন সাঙ্গীতিক শাসনে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন, অথবা উদাত্ত কোন সুর ঢেলে তাকে সংহত করেছেন নিজস্ব ঢংয়ে। কবিতা বর্ণনাত্মক শিল্পকর্ম নয়, দুর্বোধ্য না হলেও দুরূহ শিল্পকর্ম। এজন্যে সাদামাটা সাধারণ শব্দ লিপিবদ্ধ করলে তা কবিতা হয়ে ওঠে না। কবিতায় সাধারণ শব্দও অসাধারণ হয়ে ওঠে যথাযথ কাব্যিক প্রয়োগে। সাধারন অনুভূতিকে অসাধারণ করে তোলাই কবিত্ব। যা খালেদ মাহবুব মোর্শেদের বেলায় দৃশ্যমান। তাঁর কাব্যের পঙক্তিতে পঙক্তিতে দ্যুত্যিময়, অর্থময়, বিস্ময় বাক্সময় অজস্রশব্দ জন্ম নিচ্ছে, ফুটে উঠছে, ছুটে যাচ্ছে, শব্দ করছে, ফেটে যাচ্ছে, ছিটকে পড়ছে, মাথা দুলিয়ে নাচছে, গাইছে। কখনো পুরোনো শব্দ নতুন হচ্ছে, কখনো নতুন শব্দ তীব্র হচ্ছে। যা পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক অবচেতন নিদ্রালুতার গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠতে সচেষ্ট এবং সময়কে দেখার যে গভীর দৃষ্টিভঙ্গি কবির জন্য প্রয়োজন তা সঠিকভাবেই ওঠে এসেছে কবিতার পর কবিতায়। তিনি চোখ- কান খোলা রেখেই বাস্তবতার অনুষঙ্গসমূহ শিল্প-মাত্রা-জ্ঞানে তুলে ধরেছেন ‘মহাপ্লাবনের পলি’ গ্রণ্হে। বিশেষ করে ‘মহাপ্লাবনের পলি’ কাব্যের দীর্ঘ কবিতা ‘জাতিস্মর’- এ বিষয়বস্তু উচ্চকিত হয়েছে, শক্তি সঞ্চারিত হয়েছে সৃস্টিতে- তেমনি নতুন আঙ্গিকে এসেছে নতুন প্রকাশ প্রবর্তনা। এখানেই তাঁর কবিতা স্বতন্ত্র। এই স্বতন্ত্র স্বীকৃতি রয়েছে তাঁর ‘জাতিস্মর’ কবিতায়:
‘আচম্বিত মনে পড়ে ক্ষুধার কাহিনী, তৃষ্ণার কাহান
কামের কামান
যুদ্ধের ঘোষনা দিলে প্রতিপক্ষের সন্ধান মেলে না কোথাও’
কবিতাটিতে মানুষের একাকিত্বের বদলে চলমান সময়ের কালিক ধারাবাহিকতার ‘শিল্প-ভাষ্য’ তৈরি করেন। পৃথিবী তো একটা নিয়মের ভেতর দিয়েই চলে। এই কবিতায় তাঁর শিল্পসত্তার অনুভব ও সমস্ত বিষয়কে কিছু নিয়মের ভিতরে রেখেই মানুষের নিয়মিত যাপনবোধকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। যাতে ইহজাগতিক সমাজ- সভ্যতার বিকাশই প্রধান্য পেয়েছে। কবিতাটিতে আছে পরিমিত ও মার্জিত রুচিবোধ উদ্বোধনের সামূহিক বিকাশ। আছে মানুষের দুঃখ- বেদনার উপভোগ্য মর্মভেদী যাতনা। বাস্তবে কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদ একজন কবিসুলভ ব্যক্তিত্ব। সমর্পিত তিনি কবিতার রূপ- সৌন্দর্যের প্রতি। কবিতা তাঁর ধ্যান- জ্ঞান। প্রতিটি মুহূর্তে কাটে তাঁর কাব্যিক ভাবনায়। তিনি তো প্রকৃত কবি-যিনি নিরন্তর লিখে যেতে পারেন কবিতা। আড্ডায় কিংবা একান্ত সময়েও তিনি কবিতার বিষয়ে কথা বলেন। নারী-প্রেম, প্রকৃতি-প্রেম মানব সমাজের মানুষজনের আনন্দ-বেদনা সবই আছে তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিমন তাই এক আশ্চর্য নান্দনিকতার অতল আধার। খালেদ মাহবুব মোর্শেদের কবিতায় তাঁর আত্মগত ভাবনাসমুহে এক প্রকার শিল্পপ্রতিমা বিনির্মাণের প্রচেষ্টা থাকে। এটা তাঁর সহজাত বৈশিষ্ট্য। মানুষের ভেতরে প্রতিনিয়ত ক্ষরণের যে রক্তরাগ ক্রূরস্রোত বহমান- তার শিল্পধারক তিনি। এক প্রকার অন্তর্গত ক্ষরণ ও রূপ- স্বরূপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন তিঁনি তার কবিতায়। অপরূপ ধারাভাষ্য নির্মাণ করারও নিপূণ কারিগর তিনি। জীবনবৃক্ষের চারিদিকে যা কিছু আছে তা যদি হয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রও সেখান হতেও তিনি শিল্পের ডালপালা কবিতায় বিস্তার করেন অবলীলায়। যা একজন কবির জন্য অবধারিতভাবে জরুরী। তাই কবি অকপটে বলেন-
‘শীত- শান্ত উত্তরের হাওয়া সমুদ্রকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে
ঢেউয়ের অজগরেরা শীতনিদ্রার বালিশে মাথা রেখে চুপ
আর বালুকার পাখা ওড়ে নিঃসঙ্গ বুককিলানীর চরে
যেখানে স্রোতের তলে ডুবে রয় বেশূমার নীল’
অসাধারণ এক জীবনদর্শন শব্দমঞ্জুরির সুরভিত আভায় আলোকিত করেন কবিতার সৌষ্ঠব শিল্পশরীর। বোধের গভীরে কবি ফেললেন নোঙর, জীবনকণার রহস্য সন্ধানে রাখলেন সহস্র বৎসরের প্রশ্নবান, অসীমের নক্ষত্রপুঞ্জে কবির ধ্যান ও ধারণা তাঁর ভেতরে থাকা যোগী ভাবকে করলো উন্মোচন। কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদ জীবনকে নিয়ে ভেবেছেন, ভেবেছেন জীবনের হেতু প্রত্যয়, জীবনের সমাপ্তি কিংবা ঘূর্ণনের আবর্তে শঙ্কাকুল প্রাণ-আর, একটা বিমূর্ত বিস্ময়কর বিজ্ঞান তাঁর মেধা ও মননকে তাড়িত করেছে সবসময়। তাই মেটাফিজিক্যাল বা অধিবিদ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে কবির আগ্রহ তাঁর কবিতায় সজীব হয়েছে বারবার। বাংলা কবিতায় অলংকারশাস্ত্রের ব্যবহার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলেও প্রত্যেক কবির দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্হাপনা কৌশলের ভিন্নতার কারনে কবিতা নতুন রূপ ধারন করে। তাঁর কাব্য ভাষা উন্নত, প্রবুদ্ধ এবং ব্যাকরণনির্ভর বিকশিত চৈতন্যের ভাষা। কাজেই কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদের কবিতার শিল্পসুষমা বিশ্লেষণ করতে হলে অলংকার প্রয়োগ, শব্দ ব্যবহারের কৌশল, ভাষা প্রয়োগের দক্ষতা, কাব্যের নির্মাণ শৈলী ইত্যাদি বিষয় সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যেমন: ‘অপ্রাত্যহিক’ কবিতায় কবি চন্দ্রিমার স্রোতে ভাসিয়ে দেন সদাগরির নাও- আর তামাটে ঠাঁটে মন্জরিত মাংসল মুরলী-
‘আমাকে করেছো গ্রাস, আগাগোড়া আমর্ম গ্রহণ
অবিকল চাঁদ এসে গিলে নিলো সূর্যের প্রতাপ
সব ফুল শূন্য করে মধুপোকা রাণীতে প্রণত
মুমুর চুমুর দাগ লেপ্টে অঙ্গের প্রচ্ছদে’
দোলায়িত মনের পর্দায় কবিতার রহস্যময় সৌন্দর্যের দেখা পেতে হলে পাড়ি দিতে হয় শব্দের সিঁড়ি। কবি মুমুর চুমুর দাগ মুছতে চান না। যদিও আমরা স্বীকার করি, ব্যঞ্জনাই কবিতার প্রাণ। তবে শব্দ যদি ছত্রিশ ব্যঞ্জনায় বেজে না উঠে, তাহলে মুমুর চুমুর প্রাণপ্রতিষ্টায় বিঘ্ন ঘটে বৈকি। খালেদ মাহবুব মোর্শেদ শব্দ সচেতন কবি। কবিদের তাই হওয়া উচিত। শব্দের অন্তর্গত ধ্বনির প্রতি তাঁর কান যতটা সজাগ, ততটা সমসাময়িক কবিদের মধ্যে বেশি দেখা যায় না। ‘মহাপ্লাবনের পলি’ কাব্যে শব্দকে তিনি বাজিয়েছেন গীতিময় সুরে। শব্দের গায়ে মাখিয়েছে চন্দনের প্রলেপ। কখনো কখনো কবি’র চুমু হয়ে উঠেছে অতীন্দ্রিয়। রক্ত মাংসের মানবীকে ছেড়ে এই চুমু ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বচরাচরের কোনো এক অসীম শক্তির ক্যানভাসে। কবি খুঁজেছেন স্বতন্ত্র এক পথ। যে পথে কেউ যায়নি, না মানুষ, না প্রাণি, না জীবিত, না মৃত। কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদ প্রায় সময় মর্মবীজকে উপলব্ধি করে। তাঁর কবিতার অস্হিতে ছড়িয়ে আছে কবি কোলরিজের ক্রিয়েটিভ থিউরি, ইমাজেনেশন সম্পর্কে ব্যাখা, টি এস এলিয়েটের ট্রেডিশনাল বিষয়ক ধারণা এবং সে সম্পর্কে পোক্ত ধারণা। তাই তিনি অকপটে উচ্চারণ করেন ‘আবেহায়াতের খোঁজে’ শিরোনামের কবিতায়-
‘কী খুঁজি এখানে, এই মাঠ, বালুর ডেইল, কূল- উপকূল!
কী খুঁজি এখানে, এই পরমায়ু, নিঃশ্বাসের তীক্ষ্ণ নাভিশ্বাসে!’
কবি পুরাণ- আশ্রিত ও ইতিহাস- ঐতিহ্যমগ্ন কবি। ইতিহাসের কালচেতনার মধ্যেই খালেদ মাহবুব মোর্শেদের অভিযাত্রা। ভূগোলেও তাঁর কবিতায় সর্বদা বিবেচ্যমান। তাই তাঁর কবিতা নভোচারী নয়, তা মৃত্তিকা সংলগ্নবাস্তবতার বিচরণে প্রয়াসী। সেই চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন ‘মহাপ্লাবনের পলি’ গ্রণ্হে। ওজস্বী ও প্রসাদগুনসস্পন্ন খালেদ মাহবুব মোর্শেদের কবিতা যে অন্তঃস্হ দ্রোহকে উন্মোচন করেছে, তাতে হয়েছেন তিনি সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম প্রতীক পুরুষ। কবি’র অবস্হান, তাঁর কবি স্বভাব, বাংলা কবিতায় তাঁর অবদান নিজস্বতামণ্ডিত। তাঁর চৈতন্যপ্রবাহে ভাবগত ও বস্তুগত দ্বৈতপ্রবাহ স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান। যেসব উপাদান কবিকে সজীব করে, চলিষ্ণু করে, সর্বতোভাবে চমকপ্রদ, আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য করে, কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদের কবিতা সে সব উপাদানকে ধারন করতে আশ্চর্যজনকভাবে সক্ষম ও সফল হয়েছেন। জীবনের সত্য ও উপলব্ধির আলোয় তৈরি হয় কবির কবিতার পংক্তি। তাঁর ইচ্ছা আর বৈভবের সঙ্গে তাঁর কবিতায় মিলেছে সৃজন, মনন ও অভিজ্ঞান। কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদের কবিতায় গভীর নিমগ্ন ও সত্তার শেকড় সন্ধানের বিনম্রও সুর শোনা যায়: ‘তামাদি প্রতীক্ষা’ কবিতার শেষের লাইন দুটি একবার পড়তে চাই:
‘ফলটি পাকবে ভেবে সকলে তা দেয় গোঁফে রোজ
প্রতিদিন জুটে যায় মৃতদের জেয়াফতে স্বাদু ভূরিভোজ’
বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বের পৃথিবীতে কবি জীবনচেতনায় এক আস্তিক্যের ধ্রুবশিখা জ্বালিয়ে রাখেন। জীবনের দায় থেকে তিনি কখনোই মুক্তি চান না। বিরূপ সময় ও প্রতিবেশের প্রতি একজন জীবনমুখী কবির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে তাঁর কবিতায়। জীবনের সমস্ত দৃশ্য ও ঘটনা, ভাবনা ও বেদনার দিকে যাত্রা করেন তাঁর কাব্যবোধ। ফলে, তাঁর কবিতা ব্যক্তিচেতনাপুঞ্জের সমন্বিত সৃষ্টি হয়েও তাঁর সময় এবং সমাজের জীবনসমগ্রতার চিত্রায়ণে প্রচণ্ড আগ্রহী। সময় ও সমাজের অন্তঃস্বর আত্মস্হ করেই তিনি তাঁর কবিতার ভূমিতল রচনা করেন। সেখানে ক্রমাগত বিস্তার ও আবেগের উদ্দীপক (Emotional impulse) গভীর তাৎপর্যমন্ডিত।
‘মহাপ্লাবনের পলি’ কাব্যগ্রন্হ ঐতিহ্যের নবমূল্যায়ন বা পুননির্মাণ। আধুনিক জীবনচৈতন্যের কাছে পৌরাণিক ঐতিহ্যের অন্তসারকে নিরীক্ষাপ্রবণ শিল্পদৃষ্টি ও জীবনবোধের ঔজ্জ্বল্যে উপস্হাপন করেছেন কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদ। আবার মাঝে মধ্যে বিপরীতভাবে বেদনার আর্তিও প্রকাশমান, নিসন্দেহ যাত্রারম্ভ আমূল বদলে দিতে চান তথাকথিত নিয়মের সর্বভুক অগ্নি, বদলে দিতে চান বিধিলিপি। ‘মনুষ্য পুরাণ’, ‘যুবরেনেঁসা’, ‘দ্বন্দ্বচক্র’, ‘একান্ত ইশতেহার’, ‘অপর অপার’ কিংবা দ্বিতীয় দ্যোতনা কবির এই উচ্চারণে তাঁর স্বভাষা, ইতিহাস, লোকঐতিহ্য যেন নতুন করে প্রাণ পায়- ‘মহাপ্লাবনের পলি’ গ্রণ্হে। তারপরও তিনি এ সময়ের সামাজিক দ্বন্দ্ব, প্রসঙ্গ ও প্রকরণকে অনায়াসে কাব্যমণ্ডিত করেছেন। তিনি নাগরিক কবি হয়েও প্রকৃতির মোহময় রূপরস গন্ধ সুরকে সমানভাবে ধারন করেছেন। কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদ নিরীক্ষামুখর ও সাংকেতিক করেছেন কবিতার ভূমি। প্রকৃতির শোভাময় অলঙ্কৃত পথে হাঁটতে হাঁটতে কবি আদি প্রেমিক হয়ে ভেসে যান দেশ থেকে এক মহাবৈশ্বিক পরিক্রমণতায়- তাজমহল থেকে বৃন্দাবনের বিশালতার অনন্য মায়া মমতায়। ‘স্তুতিবাক্যের পুস্তানি’ কবিতায় কবি’র স্বীকারোক্তি স্পষ্ট:
‘যেচে প্রস্তাব দেইনি কোনো দিন
নিজেই হয়েছি গূঢ় ক্ষণে ঘোর প্রস্তাবিত
কুসুমের আচ্ছাদনে আবৃত হবার পরাবাস্তব বাসনা
পরিত্যাগ করেছে আমাকে- ‘
কবি’র বাস্তবতা নিরীহ, বনেদী। তাঁর গভীরতা সময়ের বুকে স্রোতের মতো ভাঙনের খেলা হলেও ঝুরঝুর ঝরে যায় মরীচিকা। আলেয়ার আলো যেমন হারিয়ে যায় কাছে আসলে- তেমনি ইশারা যোনো ধুধু বালুকণা। কবি প্রেম যেন অনন্ত। শেষ হবার নয়। তাই তিনি মাঘের রাতেও ফুল ফুটাতে পারেন। তিনি যমুনার কূলকে মাদকাজলে ডোবাতে পারেন। কিন্তু তারপরেও কবি চেয়েছেন তার প্রিয়া তার কাছে এমনি এমনিই ভালোবেসে স্বেচ্ছায় আসবে, হাঁটুগেড়ে বসে নিবেদন করবে পৃথিবীর তাবৎ প্রেম। কবি কখনো বিরাগী, কখনো বিদ্রোহী, কিন্তু প্রিয়ার বেলায় তিনি সবসময় কষ্টকে বরণ করে নিয়েছেন নীরবে। আসলে খালেদ মাহবুব মোর্শেদ কবি হয়েও তাঁর মধ্যে একটা সংসার, একটা ঐতিহ্য, একটা ভালোবাসা দেখা যায়। যা এ সময়ের আর অন্য কোনো কবির মধ্যে দেখা যায় না। আর এখানেই কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদ আর সব কবি থেকে একটু আলাদা। উপরোল্লেখিত কবিতার প্রধান পক্ষ কবি নিজে হয়েছেন, অনেক কবির কবিতায় তেমনটি দেখা গেছে। কিন্তু খালেদ মাহবুব মোর্শেদের আমিত্ব কোনো ঘোষণা ছাড়াই, কোনো হৈ চৈ ছাড়াই, সমগ্র কবিতা জুড়ে এমন ভাবে বসে থাকে, তাকে উপেক্ষা করার উপায় থাকেনা। এক অসীম নির্লিপ্ততা নিয়ে কবি সর্বত্র উপস্থিত। অন্যত্রও, কবি শুধু বর্ণনা করেই ক্লান্ত হন না। তিনি কবিতায় নিজেই বর্ণনা হয়ে যান, চরিত্র হয়ে যান, দৃশ্য উপমা, এমনকি বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ান। তাই প্রক্রিয়াটি কবিতায় যে dynamism বা গতিবেগ সঞ্চার করে তা প্রকৃতপক্ষে দেখা ও দেখানোর চমৎকার সমীকরণের মধ্য দিয়ে উৎসারিত। যা আজকাল কবিদের বেলায় তেমন চোখে পড়ে না। অলংকার, উপমা – উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগ, কবিতাকে ‘রূপকে’ প্রকাশ, শব্দচয়ন, নতুন শব্দ সৃষ্টি ও তার যথার্থ ব্যবহার, মূল ও ঐতিহ্যের যুগোপযোগী ব্যবহার ও বাক্য নির্মাণে কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদ খুবই সচেতন ও পারদর্শী। তাই তাঁর প্রতিটি কবিতা হয়ে ওঠেছে পাঠগ্রাহ্য ও শিল্পমান উত্তীর্ণ, যা বাংলা কবিতার ভাণ্ডারে যোগ করেছে অনন্য এক মাত্রা। এভাবেই তিনি নিজের স্বাতন্ত্র্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ‘মহাপ্লাবনের দুর্লভ পলি’ দিয়ে অনন্য কাব্যিক মহিমায়।

কবি ও প্রাবন্ধিক

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

পূর্বের নিউজ দেখুন

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

আজকের সর্বশেষ সংবাদ