
নাসের ভূট্টো
একদিকে সমুদ্র গর্জন অন্যদিকে পাহাড়ী ঝর্ণার স্বরান্তিক প্রাকৃতিক প্রান্তিক মৈথুনে কলকল কলতানে বেড়ে ওঠা উন্মাতাল কবিদের নিমগ্ন একজন- ধীবর কবি সাইয়্যিদ মন্জু। তার প্রতিটি মুহূর্ত কাটে আত্মভুক কবিতার বিচূর্ণ বিমূর্ত মনন ভাবনায়, সেই অবশ্যম্ভাবী মনন ভাবনার চূর্ণদিনলিপিতে বিরহ বেদনা অনিবার্য বলেই প্রজ্ঞাশাসিত আবেগের তোড়ে ভেসে যান এবং ভেসে যেতে যেতে কত বিনিদ্র রাতের খসড়া এক করে তৈরি করেন জোয়ার- ভাটার নান্দনিক তিথি। জলোচ্ছ্বাসের নিরন্তর ছোবলে জলজ সত্তায় যার সমুদ্র জীবন যেখানে শঙ্খের মুখে কান পাতলে সাগরের অন্তহীন গর্জন শুনা যায়, ঝিনুকের অন্ত্রতলে মুক্তোর ভেতরে লুকানো থাকে সাগরতলের বালুকণার বোধাতীত কালান্তর গল্প। বেদনার তরঙ্গমালা ক্রমশ তা যেন দীর্ঘায়ু জলসিঁড়িস্বর- নোনা সমুদ্দুর মাস্তুল হাতে শিল্পীর সাধনার যেমন বিষয় থাকে, তেমনি থাকে নির্দিষ্ট অঞ্চলও। শিল্পী সে অঞ্চলেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ওই নির্দিষ্ট অঞ্চল ভৌগলিক, বৈষয়িক; নান্দনিকও। নিজের চিন্তা, কল্পনা, প্রতিভা ও প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটিয়ে সৃষ্টিকর্মকে শিল্প রসিকদের সামনে উপস্থাপন করাই তার কাজ। কবি সাইয়্যিদ মন্জুর কবিতায় কেবল স্বপ্ন কল্পনাকে প্রাধান্য দেননি, কেবল আবেগের অঝোর ফল্গুধারাকেই প্রশ্রয় দেননি, তার কবিতায় অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার সম্মিলন ঘটিয়েছেন মুনশিয়ানার সাথে।
কল্পনাকে যে পরিমাণ প্রজ্ঞার শাসনে পরিমিতি বোধ ও নান্দনিকতা দেওয়া সম্ভব, তার পুরোটাই করেছেন সাইয়্যিদ মন্জু। ফলে তার কবিতায় ভাবালুতা প্রশ্রয় পায়নি। শব্দগুলো হয়ে উঠেছে, বোয়াল মাছের দাঁতের মতো ধারালো, নোনা হাওয়ায় ভরপুর ও গন্ধভার শূটঁকির মাচাং। কখনো- কখনো একেবারে নিরলঙ্কার শব্দগুচ্ছও সালঙ্কৃত শব্দের চেয়ে বেশি ব্যঞ্জিত হয়ে ওঠে। এর কারণ, বাকসংযম ও আবেগের সংহতি। যে কথা উপমান- উপমেয় ও চিত্রকল্পের সাহায্য ছাড়াই, সরাসরি অভিব্যঞ্জিত হওয়ার যোগ্য, ওই কথাকে অপ্রয়োজনীয় অলঙ্কারে চাপা পড়তে দেননি কবি।
কবি সাইয়্যিদ মন্জু জীবনকে দেখেছেন নিরাসক্ত দৃষ্টিতে। ফলে তার কবিতায় তীব্র আবেগের ঝলকানি নেই, কিন্তু জীবনের রুঢ়বাস্তবতার দহন আছে।
সাইয়্যিদ মন্জুর কবিতার মৌল প্রবণতা তার ইতিহাস চেতনা মহাকালের ইশারা থেকে উৎসারিত যে সমাজ সময়চেতনা সময়ের মধ্যে সংস্থাপিত মানুষের জৈবিক অস্তিত্ব এবং কালানুপাতিক পরিণতি লিপিবদ্ধ করা। মন্জু যে কারণে আলাদা সেটি হল- এ জনপদের আদিম রূপটি কবিতার সাহায্যে তিনিই ফুটিয়ে তুলেছেন। যে জনপদের ভয়াল শ্বাপদ রূপের পাশাপাশি সম্ভাবনাও তিনি আবিষ্কার করেছেন। চিত্রের যে দিকটা আবিষ্কার করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী এস, এম সুলতান। মন্জু তার কবিতায় সেই বিরল কাজটি করেছেন। সুলতানের চিত্রকলায় আমরা পাই, কৃষি নির্ভর সমাজের পেশীকুল মানুষ ও সেই মানুষের সংগ্রামশীলতা। সাইয়্যিদ মন্জু কবিতা পড়ুয়ার পাঠ- অভিজ্ঞতাকে মাঝে মাঝে অতিক্রম করে যেতে চায়। কবি মন্জু বৈচিত্র্যময় তার একটি গ্রন্থে থেকে আরেকটি গ্রন্থ সৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে আলাদা হয়ে যায়। যদিও পরিণামের একই লক্ষ্যে তার অভিজ্ঞতাকে মন্জু কাব্যগ্রন্থের নাম বিবেচনায় সে সত্য ধরা পড়ে। মন্জুর কবিতায় আদিম বাঙালিয়ানা লক্ষ্য করা গেলেও তার হাহাকার তার কাছে বর্তমানের মূল্য সর্বাধিক। কারণ, তার মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি। কবি সাইয়্যিদ মন্জুর কাছে অতীতের যে মূল্য তা ইতিহাসের সুরক্ষিত ধাম্ভিকতার মধ্যে রয়েছে। মন্জু মানুষের ক্রমিক উন্নতির সম্ভাবনায় আস্থাশীল। কবিকে হতে হবে বর্তমানের প্রতি দায়িত্ববান এবং ভবিষ্যতের দ্রষ্টা। দ্বীপের কবি সাইয়্যিদ মন্জুর প্রেম যেমন কোমল হয়ে উঠেছে সাগরের ঢেউয়ে, তেমনি প্রজ্জ্বলিত হয়েছে জীবন বিকাশের মতো ধীরে ধীরে। তার ভাষা ভিন্ন, গভীর অনুভূতির ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত ও পংক্তিতে পংক্তিতে আলোড়িত, নষ্টালজিক, দলিত মানুষের হাহাকার ও গণমানুষের মুক্তি ছড়িয়ে আছে কবিতার পর কবিতায়।
সহজ অথচ হৃদয়গ্রাহী ভাষায় কবিতা লেখেন সাইয়্যিদ মন্জু। অবচেতনার আলো- আধাঁরি নয়, বরং স্পষ্টতার দিকেই তার ঝোঁক যেন বেশী। সমকালীন প্রসঙ্গে তিনি মাঝেমধ্যে নিয়ে আসেন পুরোনো শব্দের আমেজ, তবে ছন্দসতর্কতা ও বাকসংযমের গুণে তার কবিতা পেয়ে যায় নিটোল এক অবয়ব। সমুদ্রের স্বরের মতো ছন্দের সাফাইতে মগ্ন এই কবি। প্রেমময় শিখা আলগোছে রাখেন কোরালের ঝুপড়িতে- ঢেউস্বরে। তাই ‘অনন্ত বাসনা’ কেবল হৃদয়জমিনে নিজেরই অন্ত:সারশূন্যতাকে কেবল বাজিয়ে তোলে এই ‘কালের যুবক’।
আধুনিক যুগের কবি’রা উপস্থিত কালের সংকট ধারণ করতে গিয়ে আপন রুচির পক্ষেই নিজেদের মাঠ তৈরি করেন। তাঁরা প্রায় পূর্ববর্তীদের তৈরি পথ আত্মস্থ করে নিজেদের জন্য সৃষ্টি করেন নতুন পথ। অন্তত নতুন পথ নির্মানের চেষ্টা থাকে তাঁদের। যে পথ ধরে তাঁরা দীর্ঘকাল হেঁটে আসেন, একটা সময় সে পথকেই অস্বীকার করেন। এ অস্বীকারের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের আবিষ্কারের নেশা, সৃষ্টির উন্মাদনা। গত শতকের শেষ প্রান্তে যারা কবিতার সঙ্গে প্রজ্ঞা-অভিজ্ঞতা ও কল্পনার মিথস্ক্রিয়ায় গৃহস্থালির স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠলেন, তাদের একজন কবি সাইয়্যিদ মন্জু।
আমাদের চারপাশের সঙ্গতি-অসঙ্গতি তার কবিতার অনুষঙ্গ। সবকিছু অনুধাবন করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অভিমত ব্যক্ত করা ব্যক্তির স্বতঃসিদ্ধ অভিপ্রায়। কিন্তু সবাই একই ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারেন না। কারও প্রকাশ উচ্চকণ্ঠে, কারও বা সোচ্চার, কারও কণ্ঠে বিনয়, আবার কারও কণ্ঠে ঝরে পড়ে তীব্র শ্লেষ। এই শেষোক্তদের মধ্যে পড়েন নিশ্চিতরূপে শিল্পীরা, কবিরা।
‘ মৈনাক ছুঁই নীলমুদ্রায়’ কাব্যের একটি কবিতার নাম ‘দীর্ঘায়ু বোয়াল’ এ কবিতায় দহনকালের চিত্র অঙ্কিত। তীব্র হাহাকার আর ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে, একই সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘশ্বাসের প্রকাশও।
‘প্রত্যুষের আভায় নক্ষত্রের ঘুম
পুঁটির লাশের উপর-
লিখে যায় বোয়ালের দীর্ঘায়ু হরফ
বিচ্ছেদে মাতম রক্তশিরায়
অন্তরালে হাস্যমুখ কলকাঠির সভাঘর’।
কবিতা প্রত্যহিক জীবনের অবিকল চিত্র নয়। দিনানুদিনের ঘটনাবলির সঙ্গে আরও কিছুর সংযোগ ঘটতে পারত কি না, তাও কবিতার অনুষঙ্গ হতে পারে। যদি কবির কল্পনা-অভিজ্ঞতার যথাযথ রসায়ন ঘটে। এক্ষেত্রে চতুর্পাশের ঘটনাবলির সঙ্গে কবি হৃদয়ের সম্পর্কের স্তরভেদে তা কবিতার অনুষঙ্গে রূপ নেয়। এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, প্রবুদ্ধি ও হৃদয়াকুতির সম্মিলনে যে কবিতার সৃষ্টি, সে কবিতা পাঠকের মনকে সহজে আকৃষ্ট করে না। তবে তার চিন্তার অঞ্চলকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে। সাইয়্যিদ মন্জুর কবিতা বিশেষভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন মনের সৃষ্টি। যেমন: আকস্মিক ঘটনা কিংবা তাৎক্ষণিক অনুভূতির সহজ প্রকাশ মাত্র- তবে,জটিল।
কবি যখন দূর সমুদ্রের ঢেউয়ে সাঁতার কাটা ইলিশের ছুটে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করেন, তখন প্রান্তিক মানুষের বুক ফাটা আর্তনাদ শোনা যায় তার নিজের পৃথিবীতে। তবুও থামে না কভু স্বতঃচ্ছল জীবনের পথচলা… । সময়, সমাজের রুচি ও রূঢ়চিত্র এভাবে তুলে ধরেন কবি। আপাতত এই কবিতাকে মনে হতে পারে সাধারণ ঘটনার বিবৃতিমূলক। কিন্তু আদতেই তা নয়। হৃদয়ের অনিয়ম, অত্যাচারের বিরুদ্ধে মৃদুকণ্ঠের শ্লেষোক্তিই এখানে ফুটে উঠেছে।
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো সাইয়্যিদ মন্জু যুক্তিনিষ্ঠ এবং বিজ্ঞান-মনস্ক। প্রমাণ ছাড়া অন্তঃসারশূন্য বিষয়ের প্রতি তার মোহ নেই। বস্তুসত্যের ওপর কল্পনার প্রলেপে তার কবিতা সৃষ্টি। নিজের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধিকেই সততার সঙ্গে কবিতায় রূপান্তর করেছেন। তার কবিতার বিষয়-আশয় অনেক সময় প্রকাশের আভিজাত্যে দৃশ্যমান দিগন্ত ছাড়িয়ে যায়। বিস্ময়কর হলেও সত্য, সাইয়্যিদ মন্জু শতভাগ বোধ ও অন্ত:দৃষ্টির রহস্যলীলা উন্মোচন করার প্রয়াস নিয়েছেন। এই কবিতাটি অনেকবার পড়েছি। যতবার পড়েছি ততবারই মনে হয়েছে আমাকে ধরেছে যেন এক জলভেজা বোবাকান্না জলৌকা। বাংলা কবিতার আবহমান সব ছন্দশৃঙ্খলায় সিদ্ধহস্ত বলেই তিনি ইচ্ছেমতো ভাঙতে জানেন ছন্দশৃঙ্খল। যুৎসই শব্দপ্রয়োগের সুনিপুণ বাক্যবুননে ফোটাতে পারেন অদ্ভুত কাব্যালংকারের চকিত চমক।
তিনি লেখেন- ‘অনুপ মাথিন ও নাফ কথা’ নামকরণের কবিতাটির মরণ বিলাপ- ডুবিয়ে দেন মাথিনের কুয়ায়। বিরহ এবং বেদনার এই সৌন্দর্যসন্ধান ‘মৈনাক ছুঁই নীলমুদ্রায়’ কবিতায় এসে উত্তীর্ণ হয়েছে এক পরমার্থ চেতনায়। প্রকৃতির মধ্যে আত্মভাবের বিস্তার এবং একই সঙ্গে প্রকৃতির উপাদান- সান্নিধ্যে অন্তর ভাবনার উন্মোচন কবি সাইয়্যিদ মন্জুর সহজাত বৈশিষ্ট্য।
কবি সাইয়্যিদ মন্জুর জীবন, সংসারকে দেখেছেন কখনো- কখনো দার্শনিকের চোখে। তখনই নিজেকে যেন কিছু সমাজ থেকে আলাদা করে দূরে স্থাপন করেছেন। অনেকটা রাবীন্দ্রিক ও জসীমউদদীনীয় ঘরানার কাছাকাছি। এই দুজনের সঙ্গে তার কোনোভাবেই মেলে না। কিন্তু দর্শন মেলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে, আখ্যান যায় জসীমউদ্দীনের সঙ্গে। তবু শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র কবি মন্জু। কবি ধূলিতে জং ধরতে দেখেন। তাই কাব্যের নাম হয়, ‘মৈনাক ছুঁই নীলমুদ্রায় ‘। তার কঠিন উচ্ছারণ ‘ অনুপ মাথিন ও নাফ কথা’ নামকরণের কবিতায়-
‘পাতায় পাতায় লেখা ইতিকথা পাষাণ ধীরাজ-
প্রান্তজুড়ে একাকার শরনার্থী বিষম বিরাজ’
এভাবে কবিতার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার এই সুত্র সমগ্র সংস্কৃতির আগামির ভাবনাকেও এক কাতারে এনে দাঁড় করাতে পারে। যেহেতু সাহিত্যের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কবিতা গুরুত্বপূর্ণ, তাই কবিতাকেন্দ্রিক আলোচনাটা আলাদা পরিসর দাবি রাখে বিভিন্ন আলোকে। কবি সাইয়্যিদ মন্জু স্মৃতি হারিয়ে যান নি। কবি’রা কখনো হারান না। তারা নিভতে নিভতে জ্বলে ওঠে ফের। এর ভেতর থেকেই শক্তিমান কবির হাতে নতুন জীবনের রসদ, রঞ্জন ও সহাস্য প্রতিবেদন ওঠে আসবে অনিবার্য গতিতে। আর সেই অনুপাতে অনুসন্ধিৎসু, অগ্রসর মননের পাঠকশ্রেণিও গড়ে উঠে দ্রুতগতিতে। যারা বিশ্বের বিপুল পরিবর্তনের দিকে খোলা নজর রেখেও নিজস্ব জীবনসমগ্রের তত্ত্ব- তালাশে তৎপর।
কবি তার তুলিতে অশ্রু, বিষাদ ও বেদনার রঙ মেখে জীবনের ছবি আঁকতে চেয়েছেন। এখানে স্থায়ী-অস্থায়ী ভাবনার শক্তিশালী উচ্চারণ লক্ষ্য করার মত। আর স্মৃতি নিয়ে মানুষ আর কতকাল টিকে থাকার ভান করতে পারে। বিষাদের ব্যাবচ্ছেদ করে স্মৃতিরাও নিঃসঙ্গ হয়ে নৈঃশব্দের কাছে ফিরে যায়। আরন্যক গন্ধ শুকতে শুকতে কবি জাগ্রত হন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে হারিয়ে যাননি ‘হেল- বপ ‘ ধুমকেতুর মতো। তাইতো তিনি ” মৈনাক ছুঁই নীলমুদ্রায়” কাব্যে ‘লাইলীর ঘর’ কবিতায় মনের অব্যক্ত কথা গুলো ফুটিয়েছেন শেষ লাইনে-
‘চতুর বেহেস্ত খোঁজে নমস্যে নমস্যে
ভালোবাসা চরণ ধূলোয়
লাইলীর গ্রামে মজনুর বেমালুম দৌড়
বুক ধুকপুক…’
অনুভূতির ভেতর দিয়ে কাটে কবি সাইয়্যিদ মন্জুর প্রতিটা মুহূর্ত। যেন হৃদয় অস্থির ও অশান্ত, যেন কোথাও কোন প্রকৃত শব্দরাজি নেই-যেগুলো ভালোবাসার বার্তা বহন করে। জীবন যাযাবরদের মত, ঘরে ফেরার তাড়া নেই। স্মৃতির কারাগারে বসবাস, কারাবাসই নিয়তি। জীবন আটকে থাকে কোন এক অজানা ও অদ্ভূত বিস্ময়ে।
দুর্দান্ত উত্তাপময় শব্দের পর শব্দের গাঁথুনিতে উজ্জ্বল। পাঠক হিসেবে মনে হয় কবি নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন। অনেক কিছু বদলে দেবার প্রয়াস। আবার তার মধ্যে দ্বিধার অনুপ্রবেশ। জীবনের অর্থ বুঝতে প্রচেষ্টা আছে, কিন্তু আবার সবকিছুতে অর্থহীনতার ব্যাপ্তি, অথবা যা- কিছু ঘটছে তা যেন নিতান্তই ‘পোড়ানদী খরাঘর’। পাঠককে ঠেলে নিয়ে যায় শীতল অনুভূতির অতল গহবরে। যেখানে ‘স্বপ্নবিভ্রম’ স্বাভাবিক।
কবি কখনো কখনো নৈরাশ্যবাদের আশ্রয় নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়। চারপাশের অন্ধকার যখন মনোজগতের প্রতিটি কোণায় রাজত্ব করতে চায়, তখন দিগন্তে কেউ ভোরের সূর্যোদয়ের প্রথম আভাটি আর দেখতে পায়না। আকাশ যেন তার নিত্যদিনের শৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে অন্যভাবে নিজের অবস্থান জানান দিতে চায়।
কবি লিখেছেন ‘যাপনকাল’ কবিতায়-
‘প্যাড়েল ঘুরে রথের জোরে সন্মুখ অবিরাম
গন্তব্য যেখানে যত দূর
বসে আছি বলবান যুবক চলন্ত যানে’
কবি এমন এক পৃথিবীর কথা বলছেন যেখানে রাত হয় দিনের মত করে আর দিন রাতের মত, যেখানে অন্ধরা বেশি দেখে, আর আলোকিতরা পাথর নিশ্চুপ। আইরিশ কবি ইয়েটস-এর ছায়া লক্ষ্য করা যায়। এটি এমন এক স্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে যেখানে কবিতার ভাষাকে অন্য অর্থ প্রদান করা হয়, যেখানে কবিতা আর অকবিতার পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন। এক নির্মম সময়, এক নিষ্ঠুর পৃথিবীর মুখোমুখি মানুষ। এখানে এখন প্রতিশ্রুতি নেই, এখানে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারনও নেই। এখানে ফুল ফোটেনা, এখানে পাখিদের নিরবতা বিরাজ করে। এখানে জীবন যেমন, মৃত্যুও ঠিক তেমনি।
কবি তার নিজের সঙ্গে কথোপকথনের কথা বারবার বলার চেষ্টা করেন। তার মনের ভেতর, তার মস্তিস্কে অবিরাম বয়ে যায় কথার নদী। কে বক্তা আর কে শ্রোতা তা নিরূপণ করা যেন অর্থহীন। কবি সাইয়্যিদ মন্জু এমন এক পরিস্থিতি আর পরিবেশের কথা বলছেন যেখানে কল্পনা আর দৈনন্দিন জীবনের পথচলার তফাৎ নির্ণয় করা সহজ নয়, বরং অসম্ভব এমনটাই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মানুষ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে ঘুরপাক খাচ্ছে, যেন দিকভ্রান্ত পথিক পথের সন্ধানে বেরিয়ে আবারো পথহারা। হাজারো প্রশ্ন কিন্তু কোন উত্তর জানা নেই। ঘূর্ণিপাকের মত কিছু একটা অস্থির করে তোলে মনোজগৎ; আর মস্তিষ্ক হয়ে যায় লাশবাহী গাড়ীর সাইরেন! শুধু কথা চলতে থাকে যার কোন শুরু নেই, শেষও নেই।
নির্দ্বিধায় বলা যায় দূরদর্শী সাইয়্যিদ মন্জু আচ্ছন্ন হয়ে আছেন জীবনানন্দীয় ক্লান্তিতে, যে-কারণে স্তব্দতা ঘিরে ধরে, নিঃসঙ্গতা সঙ্গী হয়, নৈঃশব্দ গান গায়। কবি যে দেশের কথা বলছেন সেটাতো নিষিদ্ধ এবং একি সাথে তার রঙ গোধূলির আকাশের মত। এখানে মানবকুল অদৃশ্য, ছায়ার মত শুধু মৃদু শব্দ পাওয়া যায়, দেখা যায়না। শব্দ? সেটাও কান্নার। কালেভদ্রে মৃদু হাসির শব্দও আসে।
সময় ও সমাজ- এ দুটি কবি সাইয়্যিদ মন্জুকে ভাবিয়েছে সবচেয়ে বেশি। তবে সময়ের চিত্র অঙ্কনে তিনি যতটা সময় নেন, সমাজের ছবি চিত্রায়নে ততটা নেন না। এ কারণে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কোনো অনিয়ম-বিচ্যুতি যখনই তাকে ব্যথিত করে, তখনই কবি শ্লেষোক্তিতে তাকে ব্যঞ্জিত করেন কবিতার শব্দে-বাক্যে-পঙ্ক্তিতে। বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনকে যুক্তিহীন আবেগে কবি সমর্থন করেন না। উল্টো প্রশ্নবিদ্ধ করেন যুক্তিনিষ্ঠ সমালোচকের মতো।
কবি সাইয়্যিদ মন্জু কবিতায় এক ধরনের শুভবোধের স্ফূরণ আছে। কবি সব কিছুতে বিশুদ্ধতা প্রত্যাশা করেন।
মন্জুর কবিতায় পাওয়া যায় মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ, প্রতিটি তরঙ্গে থাকে ঢেউ- নন্দনের কেন্দ্রবিন্দু। শব্দের তুলিতে আঁকেন মানুষের মুখ। কবিতার ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন তাদের হাসিকান্না, আশা-নিরাশা, স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গের ছবি। মানুষের জন্য কবিতা। তিনি আজীবন এই আদর্শে অটল থেকেছেন। মানুষের হৃদয়ের ব্যথায় নির্মিত তার কবিতার প্রাসাদ। অলৌকিক দুনিয়ার হাতছানি তাকে কখনোই প্রলুব্ধ করেনি। পিউর এসথেটিক্সের নামে অলীক কল্পনার জগতে তিনি হাবুডুবু খাননি, অর্থহীন শব্দের দুধমধুধারা প্রবাহিত করেননি। তার কবিতা বাস্তব পৃথিবীর রক্তমাংসের মানুষের।
Erich Heller-এর মতো তিনি বুঝেছিলেন “All great poetry is realistic.”
তাই আমরা কবি সাইয়্যিদ মন্জুর আহাজারি শুনিঃ
‘পথের শেষে কেউ নেই, না নেই
কোন পথও নেই চলার
ম্যারাথন ক্লান্তির ছায়া, সঙ্গী কেবল নিজে’।
তবে কবি সাইয়্যিদ মন্জুর কাব্য কোনোভাবেই জসীমউদ্দীনীয় নয়। বরং এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’-এর একটি দূরাগত পদধ্বনি এখানে শুনতে পাওয়া যেতে পারে। তবে এখানে নেই কোনো ভাবালুতা সর্বস্ব কাহিনির ঘনঘটা। আবার এলিয়টীয় নৈরাশ্যও পুরোপুরি এখানে গ্রাহ্য হয়নি। পোস্টমডার্নিজমের সঙ্গে মন্জুর উত্তরাধুনিক চেতনার সুক্ষ্ম পার্থক্য এখানে সুস্পষ্ট। পোস্টমডার্নিস্টদের মতো মডার্নিজমকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন না তিনি। পরন্তু মডার্নিজমকে গ্রহণ করেই, তার সঙ্গে উত্তরাধুনিকতার সমন্বয় ঘটান। তার সমসাময়িক কবিদের কবিতা পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় প্রতিভাত হবে- সতীর্থ কবিদের মধ্যে তিনিই উত্তরাধুনিকতার সফল কৃষক। এই অর্থে প্রথম যে, তার উত্তরাধুনিতা সম্পূর্ণ রূপে পশ্চিমের পোস্টমডার্নিজমকে উপেক্ষা করেছে। এবং বাংলায় নতুন রূপে তার প্রবর্তন ঘটেছে। মানবজন্ম সম্পর্কে কবি সংশয়হীন। তার চিত্তের দৃঢ়তা, তাকে নিয়ে যায় অস্তিত্ববাদের দিকে। যেখানে মানুষ টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে, নিজের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে, ব্যক্তির সঙ্গে, এমনকি প্রকৃতির সঙ্গেও। তবে এ ছোট কবিতাগুলো পড়তে পড়তে কবি বিষয় ও আঙ্গিকে ব্যাপক পরিবর্তনকামী
সহজ সরল উক্তি, বোধশক্তি বিশাল। ইতিহাস- ঐতিহ্য- পূরাণ কিংবা দর্শনে সংলগ্ন হয়ে আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবরূপ দেয়ার জন্য দ্রোহ- বিদ্রোহ প্রতিবাদ সংগ্রাম। অপ্রাপ্তির যন্ত্রণার জন্য এখন আর হাহাকার নেই, নেই ব্যাকুলতা কিংবা বেদনার অলজ্জ চিৎকার। বরং এখানে পাই আদিকালের হৃদপিণ্ডের মাঝে ‘জলের হালচাল’।
তার সময়ের কবিদের মধ্যে তিনি অন্যতম কবি, যিনি সৃষ্টিশীল নান্দনিকতা তৈরি করতে পেরেছেন। প্রকৃতি ও জীবনের অসীম সৌন্দর্যের মাঝে মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতাকে অকপটে প্রকাশ করেছেন এক নতুন ভঙ্গিতে, ভিন্ন চেতনায়। জীবনের দুঃখ বেদনাকে তুলে ধরেছেন কারুশিল্পীর শিল্পের ছোঁয়ায়। তার বাক্য চেতনা ও ভাবাবেগ রবীন্দ্র উত্তর সাহিত্যাকাশে নবতর ঘুরপাকে ভেসে আসে আমাদের কাছে। কবি সাইয়্যিদ মন্জুর সাহিত্যের উত্তরাধিকারের দায়িত্ববোধ থেকেই তৈরি করেছেন তার কবিতার শিল্পভাবনা। তিনি নিবিড় নীরব পথে নির্জনতায় খুঁজেছেন কবিতার পথঘাট। মানুষ ছাড়াও বিশুদ্ধ প্রকৃতি ও সমুদ্র গর্জন, সীমার মাঝে অসিমের বিচরণ ও আদিনাথের একাকিত্বের বর্ণনায় নির্মাণ কৌশলে সাধারণ বিষয়কে অসাধারণ করে তুলে ধরেছেন তার কবিতাসমূহ।
আসলেই কেউ মনে রাখে না বলেই কবি বাস্তবতার ঘোর ঠেলে খুঁজে ফেরেন দিগন্তের আভা, বৃক্ষের নিবিড় পাঠ।
অবিশ্বাসীদের দখলে যখন পৃথিবী, অধিকাংশ মানুষ যখন প্রথার অতলান্ত চক্রে নিপতিত, যার ফলে ধ্বংস হচ্ছে নৈতিকতা, কবিতা, মানবিকতা ও সভ্যতা। তখন কবি বোধাতীত বিস্ময়ে উচ্ছারণ করেন- ‘বেঁচে থাকার গল্প’ কবিতায়:
‘বিদগ্ধ হৃদয়ে পলায়নসুর
পালাতে পারি না
সেদ্ধ হই পুরনো আগুনে
জ্বলন্ত উনুনে বেঁচে থাকার গল্পেরা-
ঢেলে দেয় পিপাসার অগ্নি শরাব’
মন্জুর কবিতায় চিত্র রূপময়তা এতটাই স্পষ্ট যে , শব্দ মাত্রই ভেসে উঠে প্রতিটি দিন রাতের শোকের পদাবলী। কবি ব্যক্তি জীবনে নানাবিধ হতাশা, দুঃখ কষ্ট এবং অমানবিক দুনিয়ার এক প্রতিকূল পরিবেশের শিকার বলেই জীবনের ফেলে আসা স্মৃতিগুলো অনুভব করেছেন মানুষের মন এবং সময় অনুবাদ করে। বেরিয়ে এসেছেন মানুষের শ্বাশত ছায়ায়। কবির কবিতায় কিছু প্রস্তাবনা লক্ষ্য করা যায়। ‘ছায়াগ্নি’, ‘তৃষিত প্রেম’, ‘ভুলচোখ’, ‘সন্দিগ্ধ আয়না’ বা ‘শুকপাখি’ সব কবিতায় নষ্টালজিয়া থাকলেও কবি তাতে কাতর নন, কবি তার অতীতকে ফিরে আসতে আহ্বান জানান-তারপর, অতীত আর বর্তমানের তফাৎ মহাকাল চেতনার একাকার করে ফেলেন। তাই বলে মন্জুর কবিতায় হতাশা নেই, দুর্দশা নেই তা নয়- এক বিন্দু ঐশ্বরিক আলোর জন্য অথবা পাহাড় ডিঙ্গিয়ে নেমে আসা খরস্রোতা নদীর কাছে একটু বিরল জলের জন্য চাতক পাখির মতো করে তার পৃথিবী দেখতে গিয়ে বারবার বোধের ধূলোতে আটকে ফেলে জীবনের সব শুদ্ধতা। এভাবে বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে মন্জুর কবিতা। সাইয়্যিদ মন্জুর কবিতা অনেকাংশ সরল, আধুনিক জটিলতা যা এসেছে তা সরলতাকে অবগাহন করতে যেয়ে।
মনের কথাগুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন আকাশের ঠিকানায়। জড়তা রাখেননি মোটেও। প্রকাশ করেছেন ‘বিবর্ণ পিদিম’।
কবি বারেবারে নবপ্রাণের নব নন্দনের সন্ধানী। সন্ধান করেন মানুষের ভেতরের মানুষটিকে। আলাদা করেন মুখ ও মুখোশ। পুরাকাল, সমকাল আর ভাবিকাল- সকল কালের আকাশ মিলেমিশে যে একটা আলাদা ও ইশারামন্ডিত মায়াডোর নির্মাণ করতে পারে, এ তার কবিতার চলনে- বলনে মূর্ত হতে চায়, চারিত হতে চায় পাঠকের বোধেও। মত থেকে মতামত তারপর সুন্দর একটি পথ, যে পথে সমর্পিত সত্যের নিবিড় ধ্বনি এনে দেবে তাবৎ মানুষের কল্যাণ ও মূল্যায়ন। অথচ গহীন অরণ্যে নীরবতার ঝিঁঝি পোকার সরোদ কোরাসতাল ও সুর সবার শ্রবণে ধরা না পড়লেও কবির চোখ ও মন যেন প্রকৃতির অবারিত উপলব্ধি। তাই কবি বিশ্বমানুষের ভাষা বুঝেন। পৃথিবীর সিলেবাসের দিকে খেয়াল করেই পালানোর চেষ্টা করেন। বিচিত্র চেতনার কবি রূপ দেখেছেন নিজের ভেতর, অনুভব করেছেন ভেতরের একজন। যে নতুন যাত্রা আমরা কেবল দ্বীপের কবি সাইয়্যিদ মন্জুর কাছ থেকে আশা করতে পারি। তাই তিনি অকপটে স্বীকার করেন ‘ উদ্বাস্তু কাল’ কবিতায়।
কবিতাটি একবার পড়তে চাই:
‘মরুর তৃঞ্চা স্পর্শ করে আছে বুক
দূর থেকে বয়ে আসা জলধারা
কলতানে লিখে যায় আকাঙ্ক্ষার দীর্ঘায়ু’।
কবিতার রং রস আর রূপ আর রূপ যেন নিবিড় ভাবে মিশে আছে এই কবি শিল্পীর সত্তায়-তার কবিতার সমুদ্রের ঢেউ হয়ে যেন দৌড়ে বেড়ায় বঙ্গোপসাগর থেকে দূরের কোন অচিন সাগরে। অন্য জগতে- যে জগতে আমরা প্রতিটি মানুষ যাপন করছি। পাশাপাশি কবি ভুলে যাওয়ার স্পর্শে এখনো হতে পারেনি সংযত, সংহত। যেন শূণ্যতা তথা বেদনার প্রতীকী- ধারক। এই কবিতার কাব্য প্রয়াসের কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তি মানুষ, জাতিমানুষ ও বিশ্ব মানুষের সমীকৃত প্রতীতি। এই বাঙালি কবি সমকালিন বিশ্ব কবিতার এক তাৎপর্যপূর্ণ কারুকৃত মেধাবী প্রতিভু।
কবিতার পাঠক এখন কবিরাই। এমন আন্দোলিত, শিহরিত ঘুরের রেশ নান্দনিক বিভায় অমোঘ বেদনাকে বিশেষ সত্যের মুখোমুখি করতে চান কবি-তা গ্রহণ পূর্বক পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া একমাত্র কবি সাইয়্যিদ মন্জুর দ্বারায় সম্ভব। তার কবিতায় প্রেম- অপ্রেম, আশা-নিরাশা, বিনয় ঔদ্ধত্য ঘুম জাগরণের নানান অনুষঙ্গে বহুমাত্রিক দ্যোতনা তৈরি করে, সৃষ্টি করে ব্যঞ্জনাময় আলো আঁধারি।
মহৎ কবি তার কবিতার শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার দ্বারা কবিতার অবয়বে এমন বিনোদন তৈরি করেন- বিহ্বলে, আনন্দে আমরা মত্ততায় দায়গ্রস্ত হয়ে পড়ি। এই মর্মভেদী ভালোলাগা থেকে ঘরে আসার উপায় থাকে না। তার অবচেতনা, বিপন্নতা, অন্ধকার, নির্জনতা, ইতিহাস চেতনা, জাগতিক বিপরীতে অভিমান সূচক ঘুম দ্বারা আমরা আক্রান্ত, হচ্ছি এখনো। এর মধ্যে নতুন কোনো ঘুমের অনুভূতি আমাদের নিরলসভাবে আবেশ লাগিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই মহৎ কবির জুড়ি নেই বাংলার সাহিত্য আকাশে।
অসাধারণ কাব্য প্রণয়। মহাজাগতিক প্রলোভনের মতো চমক লাগিয়ে দেয়, ইঙ্গিত আছে। পাঠককে ঘুম পাড়িয়ে দেয় না সচকিত করে জাগিয়ে দেয়। যেন অর্থহীন ফ্যান্টাসির জগতের ঘুমের একটা বহুরূপ ছবি অভিজ্ঞান তৈরি করে পাঠকের। কোনো কোনো কবিতায় তীব্র একটা উল্টো বাঁক, কোনো কবিতায় ছাইচাপা আগুন, ধিকি ধিকি জ্বলছে।
তাই কবি পতিত সমাজ দেখে ক্ষুদ্ব। মানুষের জটিলতা কবিকে ব্যথিত করে। সত্য প্রকাশের অঙ্গিকারে কবি সবসময় বাউল বাতাসের মতো। যদিও তার পায়ে অবজ্ঞার মিছিল। সেই মিছিলে দাঁড়িয়ে কবি বারবার বলতে চান-
‘প্রতিধ্বনি জাগরণ হৃদয়জ বীণা
কামনার তৃঞ্চাবুকে তুমি যে ঠিকানা’। (দ্বিপদী কবিতা) কবি সাইয়্যিদ মন্জু এখনো অপেক্ষার দ্বিপ্রহরে একাকী দিন কাটে। তিনি চান সন্ধ্যার নিয়ন আলোয় খুলে যাক প্রলম্বিত শাড়ী, মহুয়া বনে কাঁপন লাগুক অথৈ জোয়ার। ধ্বংস হউক পশুদের বসতি। পবিত্র হউক মনুষ্য মন এবং ক্লান্ত চোখে দেখুক স্বস্তির আকাশ।
প্রতিক্ষণ কাব্যঘোরে আছন্ন এ- কবি সৃষ্টির শৈল্পিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ থেকে দর্শন এবং নান্দনিক সংমিশ্রণে চিন্তার নব নির্মাণে প্রাগ্রসর। তার কবিতায় সংহত উচ্চারণ ও বহুমাত্রিক ভাবে- বৈচিত্র্যে ফুটে উঠেছে আত্মক্ষরণের সর্বৈব মানচিত্র। পাশাপাশি কবি তৈরি করেছেন এসবারড়িটি এর অভ্যন্তরে সংকল্প নেই আছে স্বপ্ন, অভিনবত্বটুকু কবিতার প্রাণ এই অভিনবত্বের জন্যই একই বিষয়ে বিভিন্ন কবির কবিতা ভিন্ন ভিন্ন প্রক্ষেপণ গ্রাহ্য করতে হলে পাঠককে অবশ্যই কবিতাপ্রেমিক হওয়া প্রয়োজন। প্রেম আমাদের সর্বময় অভিযোজনের ক্ষমতা দেয়। ভালোমন্দের প্রভেদ তৈরি করাও প্রত্যেকটি কবিতা থেকে স্বতন্ত্র আস্বাদ গ্রহণের জন্য বিশেষ ছাঁচে গঠন করে দেয় আমাদের মনকে। যদিও বিষয় হিসেবে প্রেম এ সময়ের কবিতা থেকে নির্বাসিত প্রায়। কিন্তু আমাদের কবি সাইয়্যিদ মন্জু সবার জন্য তুলে ধরেছেন প্রতিভার চিরন্তন মৌলিকতা, অর্ন্তভেদী উৎকর্ষ নিঃসন্দেহে কবিকে অভিভূত ও দ্রুবিভূত করেছিলেন বলেই শিরদাঁড়া সোজা করে মানবীয় ঋজুতার দুর্বিনীত অহংকারে সচলায়তনের প্রণোদনা যোগায় কবির প্রতিটি উচ্চারণ। জয়তু দ্বীপের কবি সাইয়্যিদ মন্জু।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক


















