
অভিলাষ মাহমুদ
চট্টগ্রাম, ঢাকা কিংবা দেশের অন্যান্য বড় শহরের ব্যস্ত সড়ক মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পত্রিকা বিক্রেতাদের দৃশ্য একসময় ছিল খুবই পরিচিত। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই তাদের কাঁধে ঝুলে যেতো বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার বোঝা, আর মুখে শোনা যেতো উচ্চস্বরে শিরোনাম ডাক—“নতুন খবর!”, “আজকের খবর!”।
সময়ের সঙ্গে সেই দৃশ্য অনেকটাই ম্লান হয়েছে। তবে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এখনও শহরের কিছু মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন কয়েকজন পুরনো পত্রিকা বিক্রেতা—যারা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
ভোর থেকে শুরু হওয়া দিন : পত্রিকা বিক্রেতাদের দিন শুরু হয় ভোরে। শহরের ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে তারা ছড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন এলাকায়। চট্টগ্রামের নিউমার্কেট, জিইসি মোড়, অক্সিজেন, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট—এসব জায়গায় এখনও দেখা মেলে তাদের।অনেক বিক্রেতা নিয়মিত গ্রাহকের বাসায় পত্রিকা পৌঁছে দেন। কেউ আবার মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন ক্রেতার জন্য। বছরের পর বছর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে তারা গড়ে তুলেছেন এক ধরনের সম্পর্ক—যা শুধু ব্যবসায়িক নয়, সামাজিকও।
হারিয়ে যাওয়া স্টল, বদলে যাওয়া জীবন : চট্টগ্রামের রাহাত্তার পুলের মোড়ে, মধুবনের সামনে একসময় ছিলো একটি পরিচিত পত্রিকার স্টল। সাগীর নামে এক বিক্রেতা সেই স্টল পরিচালনা করতেন।
প্রথম আলো, সমকাল, আজাদী, পূর্বকোণ—একসঙ্গে একাধিক পত্রিকা নেওয়ার প্রবণতা তখন ছিল সাধারণ বিষয়। পরে ২০১২ সালে ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকা প্রকাশিত হলে সেটিও যুক্ত হয় আমার পাঠের তালিকায়। এই স্টলের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কও দীর্ঘ। ১৯৯৯ সাল থেকে আমি নিয়মিত তাঁর কাছ থেকে পত্রিকা নিতাম ২০১০ সাল অবধি সাগীর সাইকেলে পত্রিকা নিয়ে বলির হাট পর্যন্ত আসতেন, এবং সেই সময় থেকেই আমাদের পরিচয় দৃঢ় হয়। তার সঙ্গে নিয়মিত দেখা ও আলাপচারি ছিল আমার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। । ২০১২ সালে পূর্বদেশ পত্রিকা চালু হলে সেটাও যোগ হয়েছিলো। তিনি রাহাত্তার পুলের স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন, আর এই পরিচয় আমার পত্রিকার প্রতি আনুগত্য এবং শহরের প্রাচীন সংবাদপ্রচারের স্মৃতিকে আরও ব্যক্তিগত মাত্রা দিয়েছে। কিন্তু ২০১৫ সালে সেই স্টল বন্ধ হয়ে যায়। সাগীর পেশা ছেড়ে বিদেশে চলে যান। কারণ একটাই—পত্রিকা বিক্রি করে যে আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখা এই পরিবর্তন একটি বড় ধাক্কা দিয়েছিল। সেই স্টল শুধু ব্যবসার জায়গা নয়, আমার শহরজীবনের এক পরিচিত অধ্যায়ও হয়ে উঠেছিলো।
একই চিত্র দেখা গেছে বহদ্দারহাট এলাকার কাশবনের সামনে থাকা আরেকটি স্টলের ক্ষেত্রেও। সেই স্টলের মালিক ছিলেন সন্তোষ শীল। দীর্ঘদিনের ব্যবসা শেষে স্টলটি বন্ধ হয়ে গেছে। বহদ্দারহাট মদিনা হোটেলের সামনের স্টলটি এখনও রয়েছে। এখানে দুই ভাই, শাহাদাত ইসলাম পরিচালনা করেন। তাদের বাড়ি কর্ণফুলীর ওপারে। পত্রিকার পাশাপাশি তারা ভেণ্ডার হিসেবেও ব্যবসা চালান। এই পরিবর্তনের মাঝেও কিছু মানুষ এখনও টিকে আছেন। চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় কাজ করছেন জসীম নামে এক পত্রিকা হকার। বাড়ি নোয়াখালী, বর্তমানে থাকেন চট্টগ্রামের মোহাম্মদপুরে। প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত তিনি। যখন একটি পত্রিকার দাম ছিল ১ টাকা ৩০ পয়সা, তখন থেকেই তার যাত্রা শুরু।
জসীম বলেন, “আগে পত্রিকা বিক্রি করে ভালোই চলতো। এখন মোবাইলের কারণে সেই অবস্থা নেই। তবুও ছেড়ে দিতে পারিনি।”
তার মতে, পত্রিকার চাহিদা কমে যাওয়ায় বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও পেশার প্রতি টান তাকে এখনও এই কাজে ধরে রেখেছে।
প্রযুক্তির প্রভাব : স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট মানুষের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন অধিকাংশ মানুষ মোবাইলেই খবর পড়ে। ফলে ছাপা পত্রিকার চাহিদা কমেছে।
একসময় যেখানে একজন বিক্রেতা দিনে ২০০-৩০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করতেন, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে ৫০-১০০ কপিতে নেমে এসেছে।
আয়-সংকট ও টিকে থাকার কৌশল : এই বাস্তবতায় পত্রিকা বিক্রেতারা পেশা ধরে রাখতে নানা উপায় খুঁজছেন। চট্টগ্রামের মুরাদপুরের সেই বিক্রেতা জসীম বলেন, পত্রিকার পাশাপাশি এখন তারা মধ্যবিত্তের প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিসপত্রও বিক্রি করেন।
“পত্রিকার পাশাপাশি কিছু জিনিস না রাখলে চলা যায় না,”—বলছিলেন তিনি। মাস্ক, সিগারেট, কলম—এগুলোই এখন মূল ভরসা। পত্রিকার আয় কম, কিন্তু এই ব্যবসাটা ছাড়তে পারছি না। অনেক দিনের অভ্যাস, একটা মায়া আছে।”
জসীমের এই বক্তব্যই তুলে ধরে বর্তমান বাস্তবতা—পত্রিকা বিক্রি এখন আর একক পেশা নয়; বরং অন্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে টিকে থাকার একটি উপায়।
হারিয়ে যাওয়া একটি অভ্যাস : একসময় সকালে পত্রিকা হাতে নেওয়া ছিলো শহুরে জীবনের অংশ। শিরোনাম দেখে দিন শুরু করা, চায়ের সঙ্গে খবর পড়া—এসব অভ্যাস এখন অনেকটাই কমে গেছে।
নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই অভিজ্ঞতা থেকে দূরে। ফলে পত্রিকা বিক্রেতাদের উপস্থিতিও কমে যাচ্ছে শহরের বিভিন্ন এলাকায়।
সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম
সংবাদপত্রের পুরো প্রক্রিয়ায় পত্রিকা বিক্রেতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকরা খবর সংগ্রহ করেন, পত্রিকা তা প্রকাশ করে—আর সেই খবর মানুষের হাতে পৌঁছে দেন এই বিক্রেতাগণ।
সাগীরের মতো যারা পেশা ছেড়ে চলে গেছে, আর জসীম, শাহাদাত ইসলাম বা জসীমের মতো যারা এখনও টিকে আছেন—তাদের গল্প একই বাস্তবতার ভিন্ন দিক তুলে ধরে।
চেরাগি ( আজাদী গলি ) পত্রিকার আঁতুড় ঘর : চট্টগ্রামের চেরাগির মোড়ে আজাদী পত্রিকার গলির মুখে গনি স্টোর এখনও বিভিন্ন পত্রিকা নিয়ে আছেন তিনি। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা স্টলগুলো এখনো শহরের পুরনো স্মৃতি এবং সংবাদপ্রচারের বাহক হিসেবে কাজ করছে। সময়ের সঙ্গে লড়াই করেও, যারা টিকে আছেন তাদের এই দৃঢ়তা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এই পেশার অন্তর্নিহিত মূল্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও গল্পকার
















