
সোমা ঘোষ মণিকা
“নারীবাদ হলো নারী, পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সমান অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ধারণা। এটি পুরুষবিদ্বেষ নয়, বরং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করে ন্যায়, সম্মান ও মানবিক সমতার সমাজ গড়ার সচেতন। ”
নারীবাদ শব্দটি ইংরেজি ঋবসরহরংস থেকে এসেছে। এর মূল উৎস ফরাসি শব্দ ঋবসরহব বা ঋবসসব, যার অর্থ নারী। এর সঙ্গে ‘বাদ’ যুক্ত হয়ে যে ধারণাটি তৈরি হয়েছে, তা মূলত নারী ও পুরুষসহ সব লিঙ্গের মানুষের সমানাধিকার ও মর্যাদার তত্ত্বকে নির্দেশ করে।
সহজভাবে বলা যায়, নারীবাদ এমন একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা এবং সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সমাজে যে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য, অবহেলা ও অন্যায় রয়েছে, সেগুলোকে প্রশ্ন করা এবং তা দূর করার প্রচেষ্টাই নারীবাদের মূল উদ্দেশ্য।
আরও সহজ ভাষায় বলা যায়, নারীবাদ মানে সমাজে নারী, পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মধ্যে যে অসমতা রয়েছে তা দূর করার জন্য সচেতনভাবে কাজ করা। নারীবাদ মানেই পুরুষবিদ্বেষ নয়। বরং এটি এমন একটি ধারণা যেখানে নারী মানুষ হিসেবে সেই অধিকারগুলো লাভ করবে এবং ভোগ করবে, যেগুলো পুরুষরা দীর্ঘদিন ধরে পেয়ে এসেছে।
নারীবাদ মানে এই নয় যে পুরুষদের ঘৃণা করতে হবে বা তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। নারীবাদের মূল কথা হলো নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া। নারী যেন সমাজে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে জন্ম নিতে পারে, শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, নিজের জীবনকে উপভোগ করতে পারে এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে, সেই অধিকার প্রতিষ্ঠাই নারীবাদের লক্ষ্য।
নারীবাদী হওয়ার জন্য শুধু নারী হওয়া জরুরি নয়। যে কেউ যদি নারীর অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে সম্মান করে এবং তা প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করে, তবে তিনিও একজন নারীবাদী হতে পারেন। নারীকে সম্মান দেওয়া, তার কাজের স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ করে দেওয়াই প্রকৃত নারীবাদের চেতনা।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত “নারী” কবিতায় নারী ও পুরুষের সমতার কথা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
“সাম্যের গান গাই
আমার চক্ষে পুরুষ রমনী কোনো ভেদাভেদ নাই।
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।”
এই কয়েকটি পঙক্তির মধ্যেই নারী ও পুরুষের সমান অবদানের সত্যটি অত্যন্ত নান্দনিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
তবে সমাজে অনেক সময় নারীবাদ সম্পর্কে ভুল ধারণাও দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন নারীবাদ মানে পারিবারিক সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা করা কিংবা পুরুষের বিরোধিতা করা। বাস্তবে এগুলোর কোনোটিই নারীবাদের প্রকৃত অর্থ নয়। এগুলো ব্যক্তিগত আচরণ হতে পারে, কিন্তু নারীবাদের দর্শন নয়।
পুরুষতন্ত্র:
পুরুষতন্ত্র বা চধঃৎরধৎপযু বলতে এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা বোঝায় যেখানে পুরুষরা সমাজের প্রধান ক্ষমতাধারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়। এই ব্যবস্থায় সমাজের ক্ষমতা, সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকাংশ ক্ষেত্র পুরুষের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে।
তবে পুরুষতন্ত্র বলতে কেবল পুরুষদের বোঝায় না। অনেক সময় নারীরাও এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখেন। যেমন যখন একজন নারী অন্য একজন নারীর শিক্ষা বা স্বাধীনতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান, কিংবা একজন শাশুড়ি পুত্রবধূর প্রতি অন্যায় আচরণকে সমর্থন করেন, তখন সেই আচরণও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
পুরুষতন্ত্র মূলত এমন একটি কাঠামো যা নারীর স্বাধীনতা ও সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে রাখে। আর নারীবাদ সেই কাঠামোকে প্রশ্ন করে এবং সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়।
সংস্কৃতি ও সাহিত্যে নারীর প্রতিচ্ছবি:
শৈশব থেকে আমরা নানা রূপকথার গল্প পড়ে বড় হই। সেই গল্পগুলোতে রাজকন্যাদের সাধারণত অত্যন্ত সুন্দর, কোমল এবং অসহায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাদের উদ্ধার করতে আসে রাজকুমার। খুব কম গল্পেই দেখা যায় রাজকন্যা নিজেই সাহসী, বুদ্ধিমতী বা যোদ্ধা চরিত্রের অধিকারী।
এই ধরনের গল্পের মাধ্যমে অজান্তেই সমাজে নারীর একটি নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ চিত্র তৈরি হয়। ফলে নারীর শক্তি, জ্ঞান ও নেতৃত্বের সম্ভাবনা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
বিশ্বের অনেক দার্শনিক ও সাহিত্যিক অতীতে নারীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। উইলিয়াম শেক্সপিয়র লিখেছিলেন “ঋৎধরষঃু, ঃযু হধসব রং ড়িসধহ।” দার্শনিক নীৎসেও নারীদের সম্পর্কে নানা বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন।
তবে ইতিহাসে এমন অনেক সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদও আছেন যারা নারীর অধিকার ও মর্যাদার পক্ষে কথা বলেছেন। বাংলা সাহিত্যে বেগম রোকেয়া নারীবাদী চিন্তার অন্যতম অগ্রদূত। তাঁর লেখায় নারীশিক্ষা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক সমতার গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
ব্রিটিশ লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “ঝযধশবংঢ়বধৎব’ং ঝরংঃবৎ”-এ প্রশ্ন তুলেছিলেন, যদি শেক্সপিয়রের মতো প্রতিভাবান কোনো নারী সেই সময়ে জন্মাতেন, তবে কি সমাজ তাকে একইভাবে স্বীকৃতি দিত। এই প্রশ্নের মধ্যেই ইতিহাসে নারীর প্রতি বৈষম্যের বাস্তবতা ফুটে ওঠে।
বিশ্ব রাজনীতি ও নারীর ক্ষমতায়ন:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কার সিরিমাভো বন্দারনায়েকে ছিলেন বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। জার্মানির অ্যাঙ্গেলা মার্কেল দীর্ঘদিন সফলভাবে দেশ পরিচালনা করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেও নারী নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হন। আবার শিক্ষার অধিকার দাবি করার কারণে কিশোরী মালালা ইউসুফজাই সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিলেন। এসব ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনও অনেক স্থানে চলমান।
সবশেষে বলা যায়, নারীবাদ কোনো পুরুষবিদ্বেষী ধারণা নয়। এটি মূলত মানবিক সমতার একটি আন্দোলন। নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
সমাজ তখনই সত্যিকারের উন্নত ও মানবিক হয়ে উঠবে যখন নারীকে কেবল একটি পরিচয়ের সীমায় নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখা হবে। তাই নারীবাদ মানে বিরোধ নয়, বরং সমতা। বিভাজন নয়, বরং সম্মান ও সহাবস্থান। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে নারী ও পুরুষ উভয়ের সচেতনতা ও সহযোগিতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক ও গবেষক
















