
আবদুল্লাহ মজুমদার
একটি সংবাদপত্র কেবল সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি একটি জনপদের স্মৃতি, সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং সময়ের নির্ভরযোগ্য দলিল। একটি অঞ্চলের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংকট, সম্ভাবনা ও প্রতিবাদ যখন ধারাবাহিকভাবে একটি পত্রিকার পাতায় স্থান পায়, তখন সেই সংবাদপত্র ধীরে ধীরে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বিশেষ করে আঞ্চলিক সংবাদপত্রের পথচলা কখনোই সহজ নয়। সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্য, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং জাতীয় পরিসরে যথাযথ মূল্যায়নের অভাব সত্ত্বেও তারা মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে টিকে থাকে।
এই দীর্ঘ সংগ্রামেরই এক উজ্জ্বল অধ্যায় অতিক্রম করেছে দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম। প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বর্ষপূর্তি ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান তাই ছিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; বরং চট্টগ্রামের গণমাধ্যম, সাহিত্য, শিক্ষা, সমাজসেবা এবং জনকল্যাণে অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক অনন্য মিলনমেলা।
১ আগস্ট শনিবার বিকেল ৩টায় নগরীর কাজীর দেউরিস্থ অ্যাপোলো শপিং সেন্টারের তৃতীয় তলায় চবি হল-৩১ মিলনায়তনে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর ১৫তম বর্ষপূর্তি ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সংস্কৃতিকর্মী, সমাজসেবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে মিলনায়তন পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
পবিত্র আল-কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন চরম্বা নূরিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ সাইফুল ইসলাম। এরপর ফুলেল শুভেচ্ছায় অতিথিদের বরণ করে নেওয়া হয়। শুরু থেকেই অনুষ্ঠানজুড়ে বিরাজ করে আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
স্বাগত বক্তব্যে লেখক-সাংবাদিক এবং দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর সাহিত্য সম্পাদক আবদুল্লাহ মজুমদার বলেন, “দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম কেবল একটি সংবাদপত্র নয়; এটি চট্টগ্রামের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং গণমানুষের অধিকারের নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বর। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সত্য, ন্যায় ও জনস্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান বজায় রেখে পত্রিকাটি স্থানীয় সমস্যা, উন্নয়নের সম্ভাবনা এবং মানুষের প্রত্যাশাকে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরছে। এই দীর্ঘ পথচলায় পাঠক, লেখক, সাংবাদিক, শুভানুধ্যায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সবার অকুণ্ঠ সহযোগিতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।”
তিনি উপস্থিত প্রধান অতিথি, প্রধান আলোচক, বিশেষ অতিথি, সম্মানিত অতিথি এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “আঞ্চলিক সাংবাদিকতার ভিত শক্তিশালী না হলে দেশের সামগ্রিক গণমাধ্যমও পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। তাই স্থানীয় সংবাদপত্রকে টিকিয়ে রাখতে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।”
দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মিজানুর রহমান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন। প্রধান আলোচক ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট জুবাইদা কাদের চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক ড. মুহাম্মদ সানাউল্লাহ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. জাবেদ আবছার চৌধুরী এবং দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর সহসম্পাদক দিলরুবা শরীফ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক শাহ জালাল ও লেখক আবদুল্লাহ মজুমদার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, “চট্টগ্রাম দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। সমুদ্রবন্দর, শিল্প, বাণিজ্য এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই অবদানের তুলনায় চট্টগ্রামের স্থানীয় গণমাধ্যম আজও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত। দীর্ঘদিন ধরে নানা বৈষম্য, সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এখানকার সাংবাদিকরা অসাধারণ পেশাদারিত্ব, সততা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “স্থানীয় গণমাধ্যমকে শক্তিশালী না করলে চট্টগ্রামের উন্নয়ন, সম্ভাবনা, সমস্যা এবং জনআকাঙ্ক্ষা কখনোই জাতীয় পরিসরে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে না। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি গণমাধ্যমের বিকাশও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর ১৫ বছরের ধারাবাহিক পথচলার প্রশংসা করে ভবিষ্যতেও নির্ভীক, দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক ড. মুহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, “একটি জাতির টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি শিক্ষা, আর সেই শিক্ষার প্রসারে দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সংবাদপত্র শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না; এটি সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করে, মূল্যবোধ জাগ্রত করে এবং নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করে। শিক্ষা, সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম যে ভূমিকা পালন করে আসছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।”
তিনি বলেন, “আঞ্চলিক গণমাধ্যম যত শক্তিশালী হবে, সমাজ তত সচেতন ও গণতান্ত্রিক হবে। আমি বিশ্বাস করি, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম ভবিষ্যতেও সত্য, ন্যায় ও জনকল্যাণের পক্ষে তার দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. জাবেদ আবছার চৌধুরী বলেন, “উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় মানুষের জীবনমান, জবাবদিহি ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে। এসব ক্ষেত্রে একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গণমাধ্যম উন্নয়নের ইতিবাচক দিক যেমন তুলে ধরে, তেমনি সমস্যাগুলোও সামনে এনে সমাধানের পথ সুগম করে।”
তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের উন্নয়ন ও জনস্বার্থ রক্ষায় স্থানীয় গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকা সময়ের দাবি। দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে সাহসিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করে আসছে।”
প্রধান আলোচক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট জুবাইদা কাদের চৌধুরী বলেন, “একটি স্বাধীন, নৈতিক ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। সত্য প্রকাশের সাহস, ন্যায়বোধ এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাই সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি। চট্টগ্রাম দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী হলেও এখানকার মানুষের প্রত্যাশা, সম্ভাবনা ও সমস্যাগুলোকে জাতীয় পরিসরে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে স্থানীয় গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।”
তিনি তরুণ সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। পেশাগত নৈতিকতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং সত্যনিষ্ঠার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই একজন সাংবাদিক মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেন। গণমানুষের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সাংবাদিকতাই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করে।”
তিনি দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর সম্পাদক, সাংবাদিক, কলাকুশলী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “আঞ্চলিক সংবাদপত্রকে টিকিয়ে রাখা মানে একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের কণ্ঠস্বরকে সংরক্ষণ করা। তাই এসব গণমাধ্যমের প্রতি রাষ্ট্র, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সচেতন মানুষের আরও আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।”
বিশেষ অতিথি ও দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর সহসম্পাদক দিলরুবা শরীফ বলেন, “একটি সংবাদপত্রের শক্তি কেবল সম্পাদক বা প্রতিবেদকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর পেছনে থাকে অসংখ্য নেপথ্যকর্মীর নিরলস পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা। পনেরো বছরের এই সাফল্য আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং পাঠকের আস্থা অর্জনের যে অঙ্গীকার নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি, তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করে যাব।”
দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর বার্তা সম্পাদক আ ন ম তাজওয়ার আলম বলেন, “সংবাদ কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, সময় এবং সমাজের চলমান ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি সত্যের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা। দ্রুততার প্রতিযোগিতার এই সময়ে বস্তুনিষ্ঠতা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতা রক্ষা করাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম সেই আদর্শ ধারণ করে মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে আসছে। ভবিষ্যতেও চট্টগ্রামের সুখ-দুঃখ, সম্ভাবনা, সংকট এবং গণমানুষের প্রত্যাশাকে সাহসিকতার সঙ্গে জাতীয় পরিসরে তুলে ধরতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
বক্তব্য দেন কাশফুল লিগ্যাল এইড সার্ভিসের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট মো. হেফাজ উদ্দিন। তিনি বলেন, “একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তিশালী সহযোদ্ধা। সমাজে যখন অন্যায়, বৈষম্য কিংবা অধিকারবঞ্চনার ঘটনা ঘটে, তখন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই মানুষের পক্ষে সবচেয়ে কার্যকর কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। দায়িত্বশীল গণমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রকাশ করে না; মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকেও শক্তিশালী করে।”
তিনি আরও বলেন, “আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে জনস্বার্থ ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে যে ভূমিকা পালন করে আসছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।”
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, সংগঠক ও উদ্যোক্তাকে গুণীজন সম্মাননা প্রদান। আপসহীন সাংবাদিকতা, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন, সাহিত্য ও বার্তা সম্পাদনা, শিক্ষা, সমাজসেবা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক-সামাজিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও সম্মাননাপত্র তুলে দেওয়া হয়।
সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মিজানুর রহমান চৌধুরী, নির্বাহী সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস, বার্তা সম্পাদক আ ন ম তাজওয়ার আলম, সাহিত্য সম্পাদক আবদুল্লাহ মজুমদার, সহসম্পাদক সেলিম উল্লাহ, সহসম্পাদক মাওলানা নুর মোহাম্মদ, সহসম্পাদক দিলরুবা শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার শাহ জালাল, মামুনুর রশীদ সেলিম ও মিঠুন দাশ, অফিস ইনচার্জ মো. তারেক উল ইসলাম, দৈনিক আমাদের বাংলা-এর ব্যুরোপ্রধান মোহাম্মদ তারেকুল ইসলাম, আশরাফ ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আশরাফ আলী, সেবা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তৈয়ব শাহী, সিটি স্কয়ার রিয়েল এস্টেটের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ নুরুল কবির, সাংবাদিক মুনীর চৌধুরী, জামিলা রহমান চৌধুরী, মাহদিয়াত রহমান চৌধুরী, আশরা রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট জুবাইদা কাদের চৌধুরী, মেরিন সান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. মুহাম্মদ সানাউল্লাহ, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান শামীম, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. জাবেদ আবছার চৌধুরী, প্রেস বিডি ২৪ ডটকমের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সততা, পেশাদারিত্ব, জনকল্যাণ এবং দেশপ্রেমমূলক অবদানের স্বীকৃতি দিতেই এ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। বক্তারা বলেন, যোগ্য মানুষকে সম্মানিত করার সংস্কৃতি সমাজে ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে। এটি নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীলতা, মানবিকতা, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করে।
সভাপতির বক্তব্যে দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, “একটি সংবাদপত্র কেবল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজের বিবেক, মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন এবং সত্য প্রতিষ্ঠার এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। নানা প্রতিকূলতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং বহুমুখী চাপের মধ্যেও দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম কখনো সত্য ও জনস্বার্থের প্রশ্নে আপস করেনি। বরং মানুষের অধিকার, স্থানীয় সমস্যা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন এবং জনজীবনের নানা বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশ করে আসছে।”
তিনি আরও বলেন, “একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্রের টিকে থাকা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংগ্রাম নয়; এটি একটি জনপদের কণ্ঠস্বরকে জীবিত রাখার লড়াই। এই দীর্ঘ পথচলায় পাঠক, শুভানুধ্যায়ী, সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাহিত্যিক, বিজ্ঞাপনদাতা এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেক মানুষের সহযোগিতাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আগামী দিনেও নির্ভীক, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অটুট রাখাই আমাদের অঙ্গীকার।”
সংবর্ধনাপ্রাপ্তদের পক্ষ থেকে অনুভূতি প্রকাশ করে কয়েকজন গুণীজন বলেন, এই সম্মাননা কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের স্বীকৃতি নয়; বরং সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ আরও গভীর করার এক অনুপ্রেরণা। এমন স্বীকৃতি মানুষকে মানবকল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন এবং দেশগঠনের কাজে আরও আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান হতে উৎসাহিত করে। যোগ্য মানুষকে সম্মান জানানোর এই সংস্কৃতি সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটায় এবং নতুন প্রজন্মের সামনে অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমকে একযোগে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বিস্তার, অপপ্রচার, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার এবং পেশাগত সংকটের এই সময়ে দায়িত্বশীল, অনুসন্ধানী ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। মানুষের আস্থা অটুট রাখতে সাংবাদিকদের তথ্য যাচাই, পেশাগত নৈতিকতা এবং সত্য প্রকাশের সাহস আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
একপর্যায়ে প্রধান অতিথি, প্রধান আলোচক, বিশেষ অতিথি, সভাপতি এবং অন্যান্য অতিথিবৃন্দ ২৫ জন গুণীজনের হাতে সম্মাননা স্মারক ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন। সম্মাননা গ্রহণের পর তাঁদের ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করা হয়। করতালিতে মুখরিত মিলনায়তনে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। উপস্থিত সবাই তাঁদের অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানান।
এরপর আসে অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত। প্রধান অতিথি, প্রধান আলোচক, বিশেষ অতিথি, সভাপতি, গুণীজন এবং দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতিতে কেক কেটে পত্রিকাটির ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়। শুভেচ্ছা বিনিময়, করতালি এবং প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন। উপস্থিত সবাই পত্রিকাটির উত্তরোত্তর সাফল্য, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সংস্কৃতিকর্মী, সমাজসেবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিষয়ক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি আয়োজনটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। তাঁদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, একটি সংবাদপত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল তার প্রকাশিত সংবাদে নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা বিশ্বাস, সম্পর্ক ও দায়বদ্ধতার মধ্যেই নিহিত।
সমাপনী পর্বে দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর পনেরো বছরের পথচলার নানা স্মৃতি, সংগ্রাম, সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে পত্রিকাটি জনস্বার্থ, সত্যনিষ্ঠা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার আদর্শ ধারণ করে এগিয়ে এসেছে, সেই স্মৃতিচারণ উপস্থিত অতিথিদের আবেগাপ্লুত করে।
বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সত্য, ন্যায়, বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনস্বার্থের প্রতি অবিচল থেকে দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম আগামী দিনেও চট্টগ্রাম তথা দেশের মানুষের নির্ভরযোগ্য মুখপত্র হিসেবে সাহসী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে তাঁরা স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতি রাষ্ট্র, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিক সমাজের আরও কার্যকর সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার আহ্বান জানান।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, প্রধান সমুদ্রবন্দরের নগরী এবং শিল্প-বাণিজ্যের অন্যতম চালিকাশক্তি। অথচ এই অঞ্চলের স্থানীয় গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সীমাবদ্ধতা, বিজ্ঞাপন বণ্টনের বৈষম্য, প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সেই বাস্তবতায় দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর ১৫ বছরের এই অভিযাত্রা কেবল একটি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি আঞ্চলিক সাংবাদিকতার আত্মবিশ্বাস, দায়বদ্ধতা এবং টিকে থাকার সংগ্রামেরও প্রতীক।
একটি সংবাদপত্রের প্রকৃত শক্তি তার ছাপার অক্ষরে নয়; মানুষের বিশ্বাসে। আর সেই বিশ্বাস গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের সততা, দায়িত্ববোধ এবং জনকল্যাণে অবিচল অবস্থানের মধ্য দিয়ে। পনেরো বছরের এই অভিযাত্রায় দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম সেই বিশ্বাসের এক দৃঢ় ভিত নির্মাণ করেছে, যার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী, আরও মানবিক এবং আরও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পথ রচিত হতে পারে।
করতালির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হলেও দিনটির আবহ রয়ে যায় উপস্থিত সবার হৃদয়ে। যেন এটি ছিল কেবল একটি বর্ষপূর্তি নয়; সত্য, ন্যায়, সাহস এবং মানুষের অধিকারের পক্ষে নিরন্তর পথচলার এক নবায়িত অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারই আগামী দিনের চট্টগ্রামের গণমাধ্যমকে আরও সমৃদ্ধ, মর্যাদাবান ও জনমুখী করে তুলবে—এমন প্রত্যাশাই প্রতিধ্বনিত হয় পুরো আয়োজনজুড়ে।
লেখক: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক।
















