
আয়েশা আক্তার রিনা
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর অবস্থিত কালুরঘাট সেতু কেবল একটি অবকাঠামো নয়, এটি দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও শহরের মধ্যে সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। বহু বছর ধরে এই সেতুটি মানুষের যাতায়াত, বাণিজ্য ও যোগাযোগের একটি নির্ভরযোগ্য পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—সংকীর্ণতা, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা এবং বাড়তে থাকা যানবাহনের চাপ এই সেতুটিকে আজ আর যথেষ্ট সক্ষম রাখেনি।
এই বাস্তবতায় নতুন একটি আধুনিক সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। এটি কেবল যোগাযোগ সহজ করার বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক কার্যক্রম, শিল্প ও বাণিজ্য এবং জনজীবনের স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ প্রতিদিন যে দুর্ভোগ পোহান, তা থেকে মুক্তি পেতে একটি নিরাপদ, প্রশস্ত ও টেকসই সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। একটি কার্যকর সেতু মানে সময় সাশ্রয়, দুর্ঘটনা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি।
তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আরেকটি বিষয় সামনে আসে—নামকরণ। একটি সেতুর নাম কেবল পরিচয়ের জন্য নয়; এটি ইতিহাস, স্মৃতি এবং মূল্যবোধ বহন করে। কালুরঘাট সেতুর নতুন নির্মাণের সঙ্গে যদি শহীদ প্রেসিডেন্ট তরধঁৎ জধযসধহ-এর নাম যুক্ত করার প্রস্তাব আসে, তাহলে সেটি নিয়ে আলোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় শহীদ জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ইতিহাসের অংশ। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এই প্রেক্ষাপটে তার নাম দেশের বিভিন্ন স্থাপনায় যুক্ত রয়েছে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর নাম তার নামে রাখার প্রস্তাব একেবারে অযৌক্তিক বলা যায় না।
তবে নামকরণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—এটি যেন বিভাজনের নয়, বরং ঐক্যের প্রতীক হয়। একটি সেতু মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে; তাই তার নামও রফবধষষু এমন হওয়া উচিত, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য এবং ইতিবাচক বার্তা বহন করে। যদি কোনো নামকরণ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে সেই সেতুর মূল উদ্দেশ্য—মানুষকে সংযুক্ত করা—সেটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এখানে আরও একটি দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষের আবেগ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। কালুরঘাট নিজেই একটি ঐতিহাসিক নাম, যা এই অঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই নামের মধ্যেই একটি ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে। ফলে নতুন নামকরণের ক্ষেত্রে এই ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করে বরং সমন্বয় করার একটি পথ খুঁজে বের করা যেতে পারে।
উন্নয়ন এবং স্মৃতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ। একটি আধুনিক সেতু নির্মাণ যেমন জরুরি, তেমনি তার নাম এমন হওয়া দরকার, যা ইতিহাসকে সম্মান জানায় এবং একই সঙ্গে বর্তমানের মানুষকে একত্র করে।
চট্টগ্রামের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিলম্বিত হওয়ার সুযোগ নেই। কালুরঘাট সেতুর নতুন নির্মাণ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে এর সুফল সরাসরি মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হবে। পাশাপাশি নামকরণের প্রশ্নে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সংবেদনশীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
একটি সেতু কেবল নদীর দুই পাড়কে যুক্ত করে না; এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং ইতিহাসকেও এক সুতোয় গেঁথে রাখে। তাই এর নির্মাণ ও নামকরণ—দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা, দূরদৃষ্টি এবং মানুষের অনুভূতির প্রতি সম্মান।
বিচিক শিল্প এলাকা, কালুর ঘাট, চট্টগ্রাম


















