আজ : মঙ্গলবার ║ ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : মঙ্গলবার ║ ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ║ ১৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

কৃষকের ডুবন্ত স্বপ্ন: সোনালি শীষ আজ হাহাকারের নাম

আমেনা বৃষ্টি

বাংলার দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে যখন সোনালি ধানের নাচন থাকার কথা ছিল, যখন কৃষকের আঙিনায় নবান্নের প্রস্তুতিতে মুখর হওয়ার কথা ছিল চরাচর, সেখানে আজ কেবলই হাহাকার। মাঠের পর মাঠ পেকে আসা সোনালি ফসল আজ পানির নিচে। কৃষকের তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নগুলো এখন ঘোলাটে জলের তলে ধুঁকছে। প্রকৃতির এই নির্মম পরিহাসে আজ নিঃস্ব হতে বসেছে দেশের মেরুদণ্ড— আমাদের অকুতোভয় কৃষক। যে হাতের ছোঁয়ায় মাটিতে সোনা ফলে, সেই হাতগুলো আজ রিক্ত, শূন্য; কেবল আকাশের পানে চেয়ে থাকা ছাড়া যেন আজ তাদের আর কোনো গতি নেই।
কৃষকের কাছে প্রতিটি ফসলের মৌসুম মানেই একটি নতুন জীবন। বীজ বপন থেকে শুরু করে চারা লাগানো, নিড়ানি দেওয়া আর দিনরাত সার-কীটনাশক নিয়ে ছোটাছুটি—এই সবকিছুর মূলে থাকে একটি ভালো ফলনের আশা। কিন্তু এবারের দৃশ্যপট ভিন্ন। চৈত্র-বৈশাখের আকাশে মেঘের ঘনঘটা কৃষকের মনে আনন্দের পরিবর্তে এনেছে অজানা এক আতঙ্ক। প্রতিটি মেঘের গর্জন যেন তাদের পাঁজরে এসে আঘাত করছে।
রাত কাটে নির্ঘুম, চোখে কেবল অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি। ঘরের দাওয়ায় বসে বাতাসের গতিবেগ মাপা আর আকাশের বিদ্যুৎ চমকানো দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। সোনালি ধানের ওপর যখন শিলাবৃষ্টির তীব্র আঘাত পড়ে, তখন অসহায় চাষি কেবল দাঁড়িয়ে দেখেন; প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে তার করার কিছুই নেই। ফসলের গায়ে শিলার প্রতিটি আঘাত যেন কৃষকের কলিজায় এসে বিঁধছে। এক বুক আশা নিয়ে যে মাঠ সাজিয়েছিলেন, চোখের নিমেষে সেই মাঠ তছনছ হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি সহ্য করার মতো শক্তি কোনো কৃষকের নেই।
দেশের হাওরাঞ্চল আজ পানিতে থৈ থৈ। যে হাওর কদিন পরেই সোনালি হাসিতে ভরে ওঠার কথা ছিল, সেখানে আজ কেবল বিনাশের সুর। মাঠের বুক চিরে জেগে ওঠা কাঁচা ও আধপাকা ধানগুলো এখনো কাটার সময় পায়নি, অথচ পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টি সব কেড়ে নিতে উদ্যত। বুক সমান পানিতে নেমে আধপাকা ধান কাটার সে এক করুণ দৃশ্য—তা দেখলে পাথরের হৃদয়ও কেঁপে ওঠে। কৃষকের ঘাম ঝরানো এই স্বপ্নগুলো আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
হাওরের উত্তাল ঢেউ আর ঘোলাটে পানি যখন বাঁধ উপচে ভেতরে ঢোকে, তখন মনে হয় যেন রাক্ষুসী কোনো ক্ষুধা গ্রাস করতে আসছে কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রমকে। ধান কাটার লোক নেই, নৌকা নেই, আর যা কাটা হচ্ছে তার অর্ধেকের বেশিই অপুষ্ট। এই অপুষ্ট ধান দিয়ে না মিটবে ক্ষুধা, না হবে দেনা শোধ। হাওরের আকাশে আজ পাখির ডাক নয়, বরং কৃষকের দীর্ঘশ্বাস আর পানির ঝাপটা মিলেমিশে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি করেছে।
> “ফসলের অকাল মৃত্যুতে শুধু মাঠ ডোবে না, ডুবে যায় কৃষকের সন্তানের স্কুলের বেতন, অসুস্থ বাবার পথ্য আর আগামী দিনের বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ। এটি শুধু ফসলের বিনাশ নয়, এটি একটি আস্ত পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার গল্প।”
>
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের জনসংখ্যার বিশাল এক অংশ—শতকরা প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই হতভাগ্য মানুষগুলোর শেষ সম্বলটুকু যখন একটু একটু করে বিনাশ হয়, তখন রাষ্ট্র বা সমাজ যেন খুব একটা উচ্চবাচ্য করে না। শহরের জাঁকজমকপূর্ণ আলো আর এসি রুমের আলোচনায় কৃষকের এই বুকফাটা আর্তনাদ খুব একটা পৌঁছায় না।
উদয়াস্ত পরিশ্রমের পর যখন ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যায়, তখন কৃষকের মুখে আর কোনো ভাষা থাকে না। যে লোকটা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছে, দিন শেষে সে এখন এক অসহায় শরণার্থী। তার সাজানো সংসার, তার গবাদি পশু আর তার সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সব আজ অনিশ্চিত। হাওরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে মিশে যায় তাদের দীর্ঘশ্বাস আর নীরব কান্না। এই কান্না শুধু চোখের জল নয়, এটি এক দহন—যা ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের অন্নদাতাদের।
অধিকাংশ কৃষকই ফসল ফলানোর জন্য চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করেন। কেউ এনজিও থেকে, কেউ মহাজনের কাছ থেকে, আবার কেউবা সোনার গয়না বন্ধক রেখে। তাদের আশা থাকে ধান বিক্রির টাকা দিয়ে সব শোধ করবেন। কিন্তু যখন ধানই ডুবে যায়, তখন সেই ঋণের বোঝা পাহাড়ের মতো তাদের পিষে ফেলে। আগামী বছরের বীজ কেনার টাকা কোথায় আসবে? পরিবারের সদস্যদের মুখে দুই বেলা অন্ন তুলে দেওয়ার সংস্থান কীভাবে হবে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই।
অনেক কৃষক এখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। যারা একদিন গর্ব করে নিজের জমিতে লাঙ্গল চালাতেন, আজ তারা শহরে গিয়ে রিকশা বা দিনমজুরের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এক মৌসুমি দুর্যোগ কীভাবে একটি সমৃদ্ধ কৃষি পরিবারকে ছিন্নমূল করে দিতে পারে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ আমাদের হাওরাঞ্চল।
অতিবৃষ্টি, জোরালো হাওয়া আর অস্বাভাবিক ঝড় যেন কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের যে কুফল নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত আলোচনা, তার সরাসরি শিকার হচ্ছেন আমাদের এই প্রান্তিক কৃষকেরা। প্রকৃতির মেজাজ এখন আগের মতো নেই। ঋতুর হিসাব মিলছে না। যখন রোদ দরকার তখন বৃষ্টি হচ্ছে, আর যখন পানি দরকার তখন থাকছে খাঁ খাঁ খরা।
পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ যখন হাতের বাইরে চলে যায়, তখন সেই নিরুপায় মানুষগুলো কেবল আকাশের পানে চেয়ে থাকেন। সব কিছু থমকে গেছে; তাদের ভাষাগুলো আজ স্তব্ধ। মাঠের আল ধরে হাঁটলে আজ বাতাসের শনশন শব্দের চেয়েও বেশি শোনা যায় কৃষকের চাপা হাহাকার। মাঠের বুক চিরে জেগে ওঠা সেই ফসলগুলো যখন চোখের সামনে তলিয়ে যায়, তখন মানুষের বোধশক্তি লোপ পায়।
এত হতাশা আর বিনাশের মাঝেও কৃষকের একটাই বিশ্বাস—আল্লাহ সর্বশক্তিমান। তিনি যেমন পরীক্ষা নেন, তেমনি তিনিই উদ্ধারের মালিক। এই বিশ্বাসটুকুই তাদের এখনো খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে লড়বার শক্তি জোগায়। তারা জানেন, ধ্বংসের পরেই সৃষ্টির শুরু। এই অটল মনোবল না থাকলে হয়তো বারবার এমন বিপর্যয়ের পর কেউ আর মাঠে ফেরার সাহস পেত না। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শক্তিই হলো এই কৃষিকাজ এবং আমাদের পরিশ্রমী কৃষকেরা। তারা হারের আগে হার মানেন না। কাদা আর পানিতে ভিজে হলেও শেষ চেষ্টাটি তারা করে যান।
‘কৃষকের ডুবন্ত স্বপ্ন’ আজ কেবল একটি কাব্যিক উপমা নয়, এটি এদেশের হাজার হাজার মানুষের যন্ত্রণার জীবন্ত দলিল। প্রকৃতির সাথে লড়াই করার ক্ষমতা হয়তো আমাদের নেই, কিন্তু বিপন্ন এই কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্য আমাদের আছে। দুর্যোগকালীন ত্রাণ সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল। আমাদের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।
সঠিক সময়ে বাঁধ সংস্কার, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং দুর্নীতিরোধ—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত না করলে প্রতি বছর এই একই ট্র‍্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটবে। কৃষকদের জন্য শস্য বীমা চালু করা এখন সময়ের দাবি। যদি ফসল ডুবে যায়, তবে বীমার টাকা দিয়ে যেন তারা অন্তত টিকে থাকতে পারে, সেই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে। এছাড়া কৃষি ঋণের সুদ মওকুফ এবং নতুন করে বিনাসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিতে হলে আমাদের সনাতনী কৃষিপদ্ধতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কৃষিবিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত আগাম জাতের ধান (যা অকাল বন্যার আগেই পেকে যায়) চাষে কৃষকদের আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করতে হবে। হাওরাঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের আধুনিক ব্যবস্থা এবং স্লুইস গেটগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। আবহাওয়া বার্তার আগাম পূর্বাভাস যেন প্রতিটি কৃষকের মুঠোফোনে সহজ ভাষায় পৌঁছে যায়, সেই ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যখন কৃষক আগে থেকে জানবে দুর্যোগ আসছে, তখন হয়তো সে তার ফসল রক্ষার জন্য কিছুটা হলেও প্রস্তুতি নিতে পারবে।
মাঠের পর মাঠ ধান পচে যাওয়ার যে টক গন্ধ আজ বাতাসে ভাসছে, তা যেন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। মনে রাখতে হবে, কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ। আমরা যখন শহরে সুগন্ধি চালের ভাত খাই, তখন যেন একবার হলেও সেই ঘাম ঝরানো মুখগুলোর কথা মনে করি—যারা পানির নিচে দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য অন্ন সংগ্রহ করেছে।
এই কান্না যেন বৃথা না যায়; সোনালি ফসলের হাসি যেন আবার ফিরে আসে কৃষকের চোখে-মুখে। প্রকৃতির রুদ্ররূপ একদিন শান্ত হবে, পানি নেমে যাবে। কিন্তু যে কৃষকের স্বপ্ন আজ সলিল সমাধি হয়েছে, তাকে আবার টেনে তোলা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। মেঘ কেটে যাবে, আবারও রোদে ঝলমল করবে বাংলার ফসলের মাঠ—এই প্রত্যাশায় বুক বাঁধছে নিঃস্ব কৃষক। কারণ তারা জানে, এই মাটিই তাদের মা, আর মা কখনো সন্তানকে চিরতরে ফিরিয়ে দেন না।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

আজকের সর্বশেষ সংবাদ