আজ : ║ ║║

এনসিপির ৮.৫২ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট

দেশচিন্তা ডেস্ক: জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আট লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার ছায়া বাজেট ঘোষণা করেছে। ‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক এ বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণকে প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (৫ জুন) রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ছায়া বাজেট উপস্থাপন করেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। এ সময় দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৬২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা বেশি। তবে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ০৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশে এবং পরবর্তী অর্থবছরে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ সংযোগের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা, টিআইএন, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল আর্থিক সেবার তথ্য সমন্বয়, সম্পদ কর চালু, বন্দর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন এবং অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এনসিপির দাবি, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত ৭৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।

কর ব্যবস্থায়ও বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সাধারণ করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, নারী ও প্রবীণদের জন্য ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাকাতকে আয়কর রিবেট হিসেবে স্বীকৃতি, উত্তরাধিকার কর প্রবর্তন এবং করপোরেট কর হার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

ছায়া বাজেটে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবের পাশাপাশি সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু, ৫ হাজার কোটি টাকার শিক্ষক মানোন্নয়ন তহবিল গঠন এবং ৫ হাজার স্কুল জাতীয়করণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা, যুব উদ্যোক্তা তহবিল এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে ৫২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমান বরাদ্দের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। এ খাতে জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা চালু, জটিল রোগের চিকিৎসায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি, ময়মনসিংহ ও বরিশালে আন্তর্জাতিক মানের সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল নির্মাণ এবং ৫০০ নতুন জিপিএস-সুবিধাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষি খাতে আধুনিক শস্য বিপণন কেন্দ্র স্থাপন, কৃষকের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি সার ভর্তুকি প্রদান এবং ফসল সংরক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি।

জ্বালানি ও পরিবেশ খাতে ‘সোলার এনার্জি সোভারেনটি অ্যাক্ট’ প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ আইনের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট পণ্যে আগামী পাঁচ বছর শূন্য শতাংশ কর আরোপের সুপারিশ রয়েছে। এছাড়া ৬ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচির মাধ্যমে এক বছরে ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, ৩ হাজার অফ-গ্রিড গ্রামে সৌর মিনি-গ্রিড স্থাপন এবং ৫০ হাজার ডিজেলচালিত সেচপাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

নারী ও যুব উন্নয়নে ৫ হাজার কোটি টাকার নারী উদ্যোক্তা তহবিল গঠন, স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভ্যাট প্রত্যাহার, ছয় মাসের বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং এক মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও পুরোহিতদের সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় আনার সুপারিশও করা হয়েছে।

ব্যাংক খাত সংস্কারে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় ‘ব্যাড ব্যাংক’ গঠন, সব তফসিলি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিবেদন প্রকাশ এবং পুঁজিবাজারের আকার জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, দেশীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন, সরকারি ব্যয়ের রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং পোর্টাল চালু, গোপন সম্পদের ওপর বিশেষ কর আরোপ এবং একটি স্বাধীন বাজেট অফিস প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও ছায়া বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি নেতারা বলেন, ৭১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রণীত এই ছায়া বাজেট শুধু বিকল্প অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের একটি সমন্বিত রূপরেখা।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

পূর্বের নিউজ দেখুন

আজকের সর্বশেষ সংবাদ