আজ : মঙ্গলবার ║ ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : মঙ্গলবার ║ ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ║ ১৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থ বিরোধী বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করার দাবিতে চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের বিক্ষোভ সমাবেশ

দেশচিন্তা ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থ বিরোধী বাণিজ্য চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করার দাবিতে গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্ট চট্টগ্রাম জেলা শাখার উদ্যোগে ৬ এপ্রিল (সোমবার) বিকেল সাড়ে ৪ টায় নগরীর সিনেমা প্যালেস চত্বরে এক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বাসদ চট্টগ্রাম জেলা ইনচার্জ আল কাদেরী জয়ের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্রমিকনেতা মৃণাল চৌধুরী, বাসদ ( মার্ক্সবাদী) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সমন্বয়ক শফিউদ্দিন কবির আবিদ, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, সহকারী সাধারণ সম্পাদক নূরচ্ছফা ভূইয়া, বাসদ চট্টগ্রাম জেলা শাখার সদস্য আহমদ জসীমসহ অন্যান্য জেলা নেতৃবৃন্দ। সমাবেশ পরিচালনা করেন বাসদ( মার্ক্সবাদী) নেতা জাহেদুন্নবী কনক।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, ” বিগত অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ সরকারের সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি চরম বৈষম্যমূলক ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী। একটি সত্যিকারের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি দুটি পক্ষের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করে। কিন্তু এই চুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির এবং একটি স্বাধীন দেশের জন্য দাসখতেরই নামান্তর মাত্র । ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে ‘Bangladesh shall’ বাক্যাংশটি ১৫৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে, আর ‘United States shall’ মাত্র ৯ বার। এটিই প্রমাণ করে এই চুক্তি আমেরিকার স্বার্থেই তৈরি করা হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে মার্কিন ৬,৭১০টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে, যেখানে বাংলাদেশ পাবে মাত্র ১,৬৩৮টি পণ্যে সুবিধা।এর ফলে বাংলাদেশ বার্ষিক ১,৩২৭ কোটি টাকার আমদানি-শুল্ক রাজস্ব হারাবে। বিনিময়ে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে তা নেহাতই নামমাত্র।মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের উপর রেসিপ্রোকাল শুল্ক ৩৭% থেকে কমিয়ে মাত্র ১৯% করা হয়েছে এবং বিদ্যমান ১৫.৫% শুল্ক মিলিয়ে মোট কার্যকর শুল্কের বোঝা দাঁড়ায় ৩৪.৫%-এ। এই চুক্তি বাংলাদেশকে আন্তর্জতিক বাজার থেকে সস্তায় পণ্য কেনার স্বাধীনতা হরণ করে মার্কিন পণ্য বেশি দামে কিনতে বাধ্য করবে। গম, তুলা, রাসায়নিক ও শিল্প পণ্য, এলএনজি, প্রতিরক্ষা সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী মার্কিনীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে কিনতে হবে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, নির্বাচনের মাত্র ৬০ ঘণ্টা আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার—বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই চুক্তির অর্থ বাংলাদেশকে ১০ থেকে ২০ বছর ধরে প্রতি বছর ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা কিস্তি দিতে হবে — যা জনগণের উপর অন্যায় আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেবে।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্যিক নয়, এটি একটি কৌশলগত পরাধীনতার দলিল। চুক্তির ৪.১,৫.২,৪.৩(৪) ধারাসহ এমন শর্ত দেয়া হয়েছে যা একটা দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতিকেই ক্ষুণ্ন করা হয়।বলা হয়েছে বাংলাদেশ যদি চীন বা রাশিয়ার সাথে কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে যা এই চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে পুনরায় দণ্ডমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এর মানে হলো বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি এখন ওয়াশিংটনের ভেটো-ক্ষমতার অধীনে চলে যাবে।
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, এই ধ্বংসাত্মক চুক্তির নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। চুক্তি সম্পাদনে তাঁর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে সক্রিয় ও তৎপর। অথচ বিএনপি সরকার তাকেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে- যা জনগণের সাথে একটি নিষ্ঠুর প্রহসন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর খলিলুর রহমান নির্লজ্জভাবে বলেছিলেন- নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে কথা বলেই এই চুক্তি করা হয়েছে! অর্থাৎ বিএনপি ও জামায়াত এই দেশবিক্রির বিষয়ে ‘সম্মতি’ দিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি-জামাতের শীর্ষ নেতাদের সাথে মার্কিন প্রতিনিধির ‘কথা বলা’ মানে জনগণের সম্মতি নয়। সাংবিধানিক নীতি অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত যেকোনো চুক্তি সংসদে অনুমোদিত হতে হয়—এই চুক্তিতে তা হয়নি। তাই বিএনপি সরকারকে অবিলম্বে এই চুক্তি বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।

এছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসন ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (IEEPA)’-এর আওতায় যে ব্যাপক রেসিপ্রোকাল শুল্ক আরোপ করেছিল, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট তা বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা দিয়েছে এবং এর পরপরই মালয়েশিয়া এই বিধিনিষেধ বাতিল করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি অনুমোদন স্থগিত রেখেছে, ভারত সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছে—এই বাস্তবতায় বিএনপি সরকার কি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে মাথা নত করে রাখবে? এটি তাদের কথিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
সমাবেশে বক্তারা অবিলম্বে জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান এবং একই সাথে ডিজেলসহ জ্বালানি সংকট নিরসনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কালোবাজারি সিন্ডিকেট নিরসনের দাবি জানানো হয়।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

আজকের সর্বশেষ সংবাদ