
ভালো কাজের হোটেল একটি মানবিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য পথহারা, গৃহহীন ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সম্মান ও সহমর্মিতার সঙ্গে আহার প্রদান করা। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু খাবার বিতরণ নয়—বরং মানুষের মধ্যে মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলা। এখানে একটি পুষ্টিকর খাবারের বিনিময়ে উপকারভোগীদের উৎসাহিত করা হয় একটি ভালো কাজ করতে।
ভালো কাজের হোটেলে কেউ ক্ষুধার কারণে বা আর্থিক অসামর্থ্যের জন্য ফিরে যায় না। যে কেউ প্রয়োজন অনুযায়ী বিনামূল্যে খাবার পেতে পারে, যদি সে সমাজের জন্য ছোট একটি ভালো কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই ধারণা সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতির মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে।
বর্তমানে ভালো কাজের হোটেলের সেবা কার্যক্রম বাংলাদেশের ১৬টি স্থানে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—কমলাপুর, সাতরাস্তা, কারওয়ান বাজার, বনানী কড়াইল বস্তি, খিলগাঁও, মিরপুর-২, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, ওয়ারী, সদরঘাট, কদমতলা বাসাবো, চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি ও চকবাজার, এবং কুড়িগ্রামের চিলমারী স্টেশন ও নদীবন্দর।
এই সেবা কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন ৪,০০০-এর বেশি গৃহহীন, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে খাবার প্রদান করা হয়।
কোনো চকচকে রেস্টুরেন্ট নয়, নেই বিল দেওয়ার কাউন্টার, নেই দাম তালিকা। রাজধানীর ফুটপাত ঘেঁষে খোলা আকাশের নিচে বসে মানুষ খাচ্ছেন—কিন্তু টাকা দিয়ে নয়, একটি ভালো কাজের বিনিময়ে। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের নাম হলো ভালো কাজের হোটেল, যেখানে মানবিকতা হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় মুদ্রা।
২০০৯ সালে কিছু তরুণের হাত ধরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ এক অনন্য সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। Youth for Bangladesh-এর উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মের মূল ধারণা খুব সহজ—প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজ করো, আর তার বিনিময়ে পাবে একবেলা খাবার।
ঢাকার কমলাপুর, তেজগাঁও, কোরাইল বস্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন বসে এই ‘হোটেল’। কোনো স্থায়ী কাঠামো নেই, অনেক সময় একটি ভ্যান বা অস্থায়ী স্টলই হয়ে ওঠে রান্নাঘর ও পরিবেশন কেন্দ্র। তবুও প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে খাবার নিতে আসেন—রিকশাচালক, দিনমজুর, পথশিশু, ছিন্নমূল মানুষ।
এখানে খাবার পাওয়ার নিয়মও ভিন্ন। কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের করা একটি ভালো কাজের কথা বলেন—কেউ অসুস্থ কাউকে সাহায্য করেছেন, কেউ রাস্তা পরিষ্কার করেছেন, কেউবা কোনো বৃদ্ধকে রাস্তা পার করে দিয়েছেন। সেই ভালো কাজই তার ‘মূল্য’। তবে কেউ যদি কোনো ভালো কাজ করতে না পারেন, তবুও তাকে খালি হাতে ফেরানো হয় না। বরং তাকে উৎসাহ দেওয়া হয়—আগামীকাল যেন অন্তত একটি ভালো কাজ করে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর দর্শন—মানুষকে ভিক্ষুক বানানো নয়, বরং তাকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। আয়োজকদের মতে, “ভালো কাজ মানুষকে বদলায়, আর সেই পরিবর্তন ছড়িয়ে পড়ে সমাজে।”
খাবারের মেনুও সাধারণ কিন্তু পুষ্টিকর—ভাত, খিচুড়ি, ডাল, সবজি, কখনো মাংস। বিশেষ দিনে বাড়তি আয়োজনও থাকে। প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ১৫০০ মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
এই কার্যক্রমের অর্থায়নও আলাদা ধরনের। ‘ডেইলি টেন’ নামে একটি গ্রুপ রয়েছে, যেখানে সদস্যরা প্রতিদিন ১০ টাকা করে জমা দেন। ছোট ছোট এই অবদান মিলেই তৈরি হয় বড় একটি তহবিল, যা দিয়ে চালানো হয় পুরো কার্যক্রম।
শুধু খাবার নয়, এই উদ্যোগ এখন শিক্ষা ও মানবসেবার দিকেও বিস্তৃত হয়েছে। পথশিশুদের জন্য স্কুল, অসহায়দের জন্য সহায়তা—ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে এটি।
করোনাকালেও এই উদ্যোগ থেমে থাকেনি। বরং তখন প্রতিদিন হাজারের বেশি মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যখন অনেকেই কাজ হারিয়ে সংকটে পড়েছিলেন।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতেও এই কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক জায়গায় স্থানীয়ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে একই ধরনের উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রতিদিন এত মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা, স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয় করা, অর্থ সংগ্রহ—সবই একটি বড় দায়িত্ব। তবুও থেমে নেই এই পথচলা। কারণ এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বিশ্বাস—ভালো কাজ সংক্রামক, এটি ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ভেতর থেকে মানুষের ভেতরে।
এই ‘হোটেল’ আমাদের সমাজের প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দেয়। এখানে দান নেই, আছে অংশগ্রহণ; এখানে করুণা নেই, আছে সম্মান।
শেষ পর্যন্ত, ভালো কাজের হোটেল আমাদের একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী শিক্ষা দেয়—সমাজকে বদলাতে বড় কিছু লাগে না। প্রতিদিন একটি ছোট ভালো কাজই পারে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে। সামাজিক প্রভাব তৈরির দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে ভালো কাজের হোটেল শুধু ক্ষুধা নিবারণই করছে না, বরং ইতিবাচক আচরণ পরিবর্তনে মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে। এর মাধ্যমে গড়ে উঠছে সহমর্মিতা, মর্যাদা ও সমাজভিত্তিক সহযোগিতার একটি টেকসই মডেল।
প্রয়োজনে যোগাযোগ:
🌐 ওয়েবসাইট: https://vkhbd.org/�
📞 +8801713222343
📞 +8801873708000
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও গল্পকার

















