
দেশচিন্তা ডেস্ক: রংপুর প্রতিনিধি: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ব্যানার সম্বলিত ছবিতে জুতা নিক্ষেপকে কেন্দ্র করে রংপুর সহ সারাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছবিতে জুতা নিক্ষেপকারী ছাত্রদল নেতা আরিফুল ইসলাম আরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষমা চেয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার (৩ আগস্ট) দিনব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির ‘জুলাই জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ শিরোনামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। প্রদর্শনীতে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার পাশাপাশি ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড (জুডিশিয়াল কিলিং)’ শিরোনামে কয়েকজনের ছবি প্রদর্শন করে। এ নিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আপত্তি জানান এবং ব্যানারটি অপসারণের দাবি করেন।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে মৌখিক বাকবিতণ্ডা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উভয় পক্ষের নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেন। পরে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, চেয়ার ছোড়াছুড়ি এবং সংঘর্ষ। এতে দুই সংগঠনের একাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যান। রাত পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, পার্ক মোড় এবং আশপাশের এলাকায় দুই পক্ষের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, প্রক্টরিয়াল বডি এবং রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দপ্তর সম্পাদক শিবলী সাদিক অভিযোগ করেন, তাদের প্রদর্শনীতে থাকা ছবি সরিয়ে ফেলতে ছাত্রদল চাপ সৃষ্টি করে। তারা বিষয়টি প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা বললেও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা অতর্কিত হামলা চালান। তার ভাষ্য, তাদের সভাপতির ওপর হামলার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে প্রক্টর এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করলে ছাত্রদল সরে গেলেও কিছু সময় পর আবারও লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে হামলা চালানো হয়। আত্মরক্ষার জন্য তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন দাবি করেন, যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছবির পাশে প্রদর্শন করায় তারা আপত্তি জানান। ছবি সরানোর অনুরোধ করতেই ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা চেয়ার নিক্ষেপ ও হামলা চালায়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কারমাইকেল কলেজসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বহিরাগত এনে ছাত্রশিবির ছাত্রদলের ওপর হামলা চালায়। মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনের চেতনাবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা আপস করবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংঘর্ষের পরদিন মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তাজহাট থানায় একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায়। প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, একই সময়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করায় ক্যাম্পাসে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে ১৪৪ ধারা জারিসহ পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের অনুরোধ জানানো হয়। তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরোধ পাওয়ার পর পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল, রংপুর মহানগর ছাত্রদল এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী অবস্থান নেন। পরে তারা বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে কয়েকজন ছাত্রদলের নেতাকর্মী ‘রাজাকার’ লেখা একটি ব্যানারে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াতের সাবেক নেতাদের প্রতিকৃতিতে জুতা নিক্ষেপ কর্মসূচি পালন করেন। ব্যানারে মতিউর রহমান নিজামী, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, আলী আহসান মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, মীর কাসেম আলীসহ আরও কয়েকজনের ছবি ছিল। এ সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং তাদের দাবি অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
ফেসবুকে ক্ষমা চাইলেন আরিফ
কর্মসূচি চলাকালে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছবিতে জুতা নিক্ষেপকারী হিসেবে পরিচিত কারমাইকেল কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা আরিফুল ইসলাম আরিফ রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ব্যানারে থাকা ছবিগুলো তিনি খেয়াল করেননি। পোস্টে তিনি লেখেন, “আমি একমাত্র আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, ওনার ছবিটি দেখিনি। আপনারা অনেকে অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু একটুও দুঃখ পাইনি। কারণ ওনাকে নিয়ে অন্য কেউ এটা করলে আমি-ও এমনটাই করতাম। কান্না করার পরও মনকে শান্তনা দিতে পারতেছি না। আপনাদের মনে যে কষ্ট দিয়েছি, তার জন্য আমি লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। সবাই ক্ষমা করবেন।”এই পোস্ট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। কেউ তার ক্ষমা প্রার্থনাকে ব্যক্তিগত অনুশোচনা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ ঘটনাটিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
উদ্বেগে সাধারণ শিক্ষার্থীরা
টানা দুই দিনের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে শিক্ষা কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও প্রশাসন জানিয়েছে।











