আজ : রবিবার ║ ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : রবিবার ║ ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ║ ৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

মুহররম: ত্যাগ, সত্য ও ন্যায়ের এক অবিস্মরণীয় শিক্ষা

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহররম। এ মাসকে ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। মুহররমের ১০ তারিখ, যা ‘আশুরা’ নামে পরিচিত, মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এই দিনটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক নয়, বরং সত্য, ন্যায়, ত্যাগ ও আদর্শের জন্য আত্মোৎসর্গের এক অনন্য শিক্ষার উৎস।
ইসলামি ইতিহাসে ১০ই মুহররমের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। বিভিন্ন হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, এ দিনে মহান আল্লাহ তাঁর অনেক নবীকে বিশেষ অনুগ্রহ দান করেছিলেন। বিশেষ করে, হজরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ কারণে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আশুরার দিনে রোজা রাখার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হিসেবে গণ্য হয়। তাই এ দিনের ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে ১০ই মুহররমের সঙ্গে যে ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও স্মরণীয়, তা হলো কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা। হিজরি ৬১ সালের ১০ই মুহররম ইরাকের কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল মানব ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়। মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইয়াজিদের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।
ইমাম হুসাইন (রা.) ক্ষমতা বা পার্থিব স্বার্থের জন্য সংগ্রাম করেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধকে রক্ষা করা। তিনি অন্যায়, জুলুম ও স্বৈরাচারের কাছে মাথানত করতে অস্বীকৃতি জানান। কারবালার প্রান্তরে তিনি তাঁর পরিবার ও অল্পসংখ্যক সঙ্গীকে নিয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকেও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। শেষ পর্যন্ত তিনি শাহাদাত বরণ করেন, কিন্তু অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি।
কারবালার ঘটনা আমাদের শেখায় যে, সত্যের পথে চলা কখনো কখনো কঠিন হতে পারে, কিন্তু ন্যায় ও আদর্শের জন্য ত্যাগ স্বীকারই একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে। আজকের সমাজে যখন অসত্য, দুর্নীতি, অবিচার ও নৈতিক অবক্ষয় নানা রূপে বিস্তার লাভ করছে, তখন কারবালার শিক্ষা নতুন করে আমাদের সামনে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ছাড়া শান্তি ও কল্যাণ সম্ভব নয়।
আশুরা আমাদের আত্মসমালোচনারও সুযোগ করে দেয়। আমরা নিজেদের কর্ম, আচরণ ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারি। এই দিনটি কেবল শোক প্রকাশের জন্য নয়, বরং আদর্শিক চেতনা ধারণ করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর জীবন ও আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নৈতিকতার প্রশ্নে আপস করা উচিত নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়ানো এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য কাজ করাই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানরা ১০ই মুহররম নানা ধর্মীয় কর্মসূচির মাধ্যমে পালন করে থাকেন। কেউ রোজা রাখেন, কেউ দোয়া ও ইবাদতে সময় ব্যয় করেন, আবার কেউ কারবালার ঘটনার শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন। তবে আশুরার মূল শিক্ষা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন আমরা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা ও ত্যাগের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারব।
১০ই মুহররম তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক দিবস নয়; এটি মানবতার জন্য এক চিরন্তন বার্তা। কারবালার রক্তস্নাত প্রান্তর আমাদের শেখায় যে, সত্য কখনো পরাজিত হয় না এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না। সময়ের প্রবাহে বহু সাম্রাজ্য ও শাসক বিলীন হয়ে গেছে, কিন্তু ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আদর্শ আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত।
আসুন, আশুরার এই মহান দিনে আমরা আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার করি, অন্যায় ও অসত্যকে পরিহার করি এবং সত্য, ন্যায় ও মানবকল্যাণের পথে চলার প্রত্যয় গ্রহণ করি। এটাই হবে ১০ই মুহররমের প্রকৃত শিক্ষা এবং কারবালার শহীদদের প্রতি আমাদের সর্বোত্তম শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখকঃ প্রাবন্ধিক

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

পূর্বের নিউজ দেখুন

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

আজকের সর্বশেষ সংবাদ