আজ : রবিবার ║ ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : রবিবার ║ ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ║ ৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

আমি সেই অবহেলা, আমি সেই নতমুখ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: মৃত্যুর পরও যে কবি জীবনের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন

নাঈমুল মাসুম
“আমি সেই অবহেলা,
আমি সেই নতমুখ,
নীরবে ফিরে যাওয়া অভিমান-ভেজা চোখ।”
এই কয়েকটি পঙ্‌ক্তিই যেন রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সমগ্র জীবন ও কবিসত্তার এক অনিবার্য পরিচয়। তিনি শুধু নিজের ব্যক্তিগত বেদনার কথা বলেননি; তিনি উচ্চারণ করেছিলেন একটি সময়ের, একটি জাতির, একটি প্রজন্মের অবহেলা, ক্ষোভ, স্বপ্নভঙ্গ এবং প্রতিরোধের ভাষা। তাই তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরও মনে হয়, রুদ্র কোথাও যাননি। তিনি রয়ে গেছেন আমাদের বিবেকের ভেতর, প্রতিবাদের মিছিলে, প্রেমের দীর্ঘশ্বাসে, আর অসমাপ্ত স্বপ্নের পাশে।
রুদ্রের জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর সৃজনের ব্যাপ্তি বিস্ময়কর। তিনি এমন এক সময়ে লিখেছিলেন, যখন স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস ধীরে ধীরে বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে আঘাত পাচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে যে বৈষম্য, হতাশা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছিল, রুদ্র তার বিরুদ্ধে কলমকে অস্ত্র করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, স্বাধীনতা কেবল পতাকা অর্জনের নাম নয়; স্বাধীনতা মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং স্বপ্নের নিরাপত্তারও নাম।
রুদ্রের কবিতায় প্রেম আছে, কিন্তু সেই প্রেম নিছক রোমান্টিক আবেগে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর প্রেম মানুষের প্রতি, দেশের প্রতি, জীবনের প্রতি। তাঁর প্রেমের মধ্যে যেমন বিচ্ছেদের কান্না আছে, তেমনি আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। এ কারণেই তাঁর কবিতা ব্যক্তিগত অনুভূতিকে ছাড়িয়ে সামাজিক চেতনায় রূপ নেয়।
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে রুদ্রকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন আরও বেড়েছে। কারণ তিনি যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, সেগুলোর অনেকগুলোর উত্তর আজও আমরা খুঁজে পাইনি। সমাজে বৈষম্য আছে, ক্ষমতার অপব্যবহার আছে, দুর্নীতি আছে, মানুষের কণ্ঠরোধের প্রবণতা আছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির ভিড়ে মানুষ ক্রমশ একাকী হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্চকণ্ঠ উপস্থিতি থাকলেও আত্মার গভীরে জমে থাকা নিঃসঙ্গতা আরও ঘন হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রুদ্রের কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা।
রুদ্র ছিলেন আপসহীন। তিনি ক্ষমতার প্রশংসা করে কবিতা লেখেননি। তিনি জনপ্রিয়তার জন্য নিজের ভাষা বদলাননি। তাঁর কবিতায় যে ক্রোধ, তা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে; যে ভালোবাসা, তা ছিল মানুষের প্রতি। তাই তাঁর কাব্য কখনো স্লোগানে পরিণত হয়নি, আবার নিছক অলংকারও হয়ে ওঠেনি। তাঁর শব্দের ভেতরে ছিল রক্তের উষ্ণতা, জীবনের সত্য এবং সময়ের নির্মমতা।
তাঁর অকালমৃত্যু বাংলা সাহিত্যকে এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে দাঁড় করিয়েছে। আমরা প্রায়ই ভাবি,যদি তিনি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তাহলে বাংলা কবিতা আর কত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারত! কিন্তু হয়তো কবির জীবনকে বছর দিয়ে নয়, আলো দিয়ে মাপতে হয়। সেই আলো রুদ্র রেখে গেছেন তাঁর কবিতায়, তাঁর উচ্চারণে, তাঁর নির্ভীক অবস্থানে।
আজকের তরুণদের জন্য রুদ্র বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি শিখিয়েছেন, কবিতা কেবল শব্দের কারুকাজ নয়; কবিতা একটি নৈতিক অবস্থান। কবিতা মানে সত্য বলার সাহস। কবিতা মানে অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকা। এমন এক সময়ে, যখন সাফল্যের সংজ্ঞা প্রায়ই জনপ্রিয়তা ও ভোগের সঙ্গে মিশে যায়, রুদ্র আমাদের মনে করিয়ে দেন,মানুষের প্রকৃত সাফল্য তার বিবেককে বাঁচিয়ে রাখার মধ্যে।
রুদ্রের ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু তার গভীরতা ছিল অসাধারণ। তিনি দুর্বোধ্যতার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখেননি। তিনি এমন ভাষায় লিখেছেন, যা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায়। এ কারণেই তাঁর কবিতা পাঠকের মুখে মুখে বেঁচে থাকে। তাঁর কবিতা পাঠের জন্য অভিধান লাগে না; লাগে একটি সংবেদনশীল হৃদয়।
মৃত্যু মানুষকে থামিয়ে দেয়, কিন্তু প্রকৃত কবিকে থামাতে পারে না। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু তাঁর উচ্চারণ আজও নতুন প্রজন্মকে নাড়া দেয়। যখনই কোনো তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে, যখনই কোনো প্রেমিক বিচ্ছেদের মধ্যেও মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারায় না, যখনই কোনো কবি সত্যকে আড়াল না করে প্রকাশ করতে চায়,সেখানে রুদ্রের আত্মা নিঃশব্দে উপস্থিত থাকে।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে বড় উপায় কেবল ফুল দেওয়া নয়, তাঁর কবিতার দর্শনকে ধারণ করা। যে সমাজে অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যায়, যে রাষ্ট্রে স্বাধীনতা কেবল কাগজে নয় বাস্তবেও প্রতিষ্ঠিত হয়, যে সাহিত্য সত্যের পাশে দাঁড়ায়,সেই সমাজই রুদ্রের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে পারে।
রুদ্র একবার লিখেছিলেন অবহেলা, নতমুখ আর অভিমান-ভেজা চোখের কথা। কিন্তু তাঁর কবিতার অন্তর্গত আহ্বান ছিল মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। তাই তাঁর স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু শোক করি না; আমরা সাহস সঞ্চয় করি। কারণ রুদ্র আমাদের শিখিয়েছেন,কবি কখনো মৃত্যুর কাছে পরাজিত হন না। তাঁর শব্দই হয়ে ওঠে তাঁর দীর্ঘতম জীবন।
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নেই—এই বাক্যটি কেবল জীববৈজ্ঞানিক সত্য। বাংলা কবিতার ইতিহাসে, প্রতিবাদের ভাষায়, প্রেমের নির্মল ব্যথায় এবং মানুষের মুক্তির স্বপ্নে তিনি আজও সমানভাবে জীবিত। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বলা যায় রুদ্রের কবিতা যতদিন মানুষের হৃদয়ে স্পন্দিত হবে, ততদিন তিনি আমাদের সময়েরও কবি, আগামী দিনেরও কবি।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

পূর্বের নিউজ দেখুন

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

আজকের সর্বশেষ সংবাদ