আজ : বুধবার ║ ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : বুধবার ║ ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ║ ২৪শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

মা-বিহীন এক জীবনের নীরব যন্ত্রণা

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক
মা—এই একটি শব্দেই লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর সব নিরাপত্তা, ভালোবাসা, আশ্রয় আর নির্ভরতা। কিন্তু সেই মা যখন চলে যান, তখন জীবন যেন এক অচেনা শূন্যতায় থেমে যায়। সময় এগিয়ে চলে ঠিকই, কিন্তু ভেতরের ঘড়িটা যেন কোথাও থেমে থাকে সেই শেষ বিদায়ের মুহূর্তেই। এমনই এক অনুভূতির নাম—“২০ বছর মা-বিহীন জীবন”।

মাকে হারানোর পর প্রথম দিন, প্রথম মাস বা প্রথম বছর—সবকিছুই থাকে অসহ্য ভারী। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সময় সেই কষ্টকে পুরোপুরি মুছে দিতে পারে না, শুধু তার রূপ বদলে দেয়। শুরুতে যে কান্না ছিল স্পষ্ট ও তীব্র, বছর পরে তা নীরব হয়ে যায়। কিন্তু নীরবতা মানেই কি কষ্ট কমে যাওয়া? বরং অনেক সময় নীরবতাই সবচেয়ে গভীর যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায়।
মা নেই—এই বাস্তবতার সঙ্গে বেঁচে থাকা মানে প্রতিদিন নতুন করে নিজেকে সামলানো। জীবনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে বড় কোনো সংকট—সবখানেই মায়ের অভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। অসুস্থ হলে যে হাত কপালে এসে জ্বর মাপত, সেই হাত আর নেই। সফলতার খবর শুনে যে মানুষটি সবার আগে হাসত, সেই মুখটি আর দেখা যায় না। জীবনের প্রতিটি অর্জনের মাঝেও কোথাও যেন একটা অপূর্ণতা থেকে যায়।
২০ বছর মানে কম সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে একজন মানুষ শৈশব পেরিয়ে যৌবনের পথ অতিক্রম করে জীবনের নানা অধ্যায় পার করে ফেলে। কিন্তু মা-বিহীন সন্তানের কাছে এই সময়টা শুধু বয়স বাড়ানোর হিসাব নয়, বরং প্রতিদিন একটি অভাবকে বয়ে চলার গল্প। অনেকেই ভাবে সময়ের সঙ্গে কষ্ট কমে যায়, কিন্তু বাস্তবতা হলো—মায়ের শূন্যতা কখনো পূর্ণ হয় না, শুধু মানুষ সেটার সঙ্গে বাঁচতে শিখে যায়।
মায়ের স্মৃতি অনেক সময় খুব সাধারণ জিনিসে ফিরে আসে—একটি রান্নার গন্ধ, একটি শাড়ির রঙ, বা শৈশবের কোনো পুরোনো সকাল। হঠাৎ করেই মনটা ভারী হয়ে ওঠে। মনে হয়, যদি তিনি আজও পাশে থাকতেন! এই “যদি” শব্দটাই অনেক সময় পুরো জীবনের সবচেয়ে ভারী প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
তবে এই শূন্যতার মাঝেও জীবন থেমে থাকে না। মানুষ ধীরে ধীরে দায়িত্ব নিতে শেখে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখে। মায়ের অনুপস্থিতি অনেককে আরও শক্ত করে তোলে, বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করার সাহস দেয়। কিন্তু সেই শক্তির ভেতরেও কোথাও একটা নরম ভাঙন থেকে যায়—যেটা কেউ দেখে না, কিন্তু অনুভব করা যায়।
সমাজে অনেক সময় আমরা দেখি, মা-বিহীন মানুষের প্রতি সহানুভূতি থাকে, কিন্তু তাদের ভেতরের নিঃশব্দ কষ্ট বোঝার সময় থাকে না। তারা হাসে, কাজ করে, স্বাভাবিক জীবনযাপন করে—কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিদিনই তারা মায়ের অভাবকে বয়ে বেড়ায়। এই অভাব কোনো বয়স মানে না, কোনো সময়ের সীমা মানে না।
২০ বছর পরে এসে একজন মানুষ হয়তো জীবনের অনেক কিছু অর্জন করে ফেলেছে—শিক্ষা, চাকরি, পরিবার বা সমাজে অবস্থান। কিন্তু মায়ের কাছে সেই মানুষটি আজও সেই ছোট্ট শিশু, যে কোনো একদিন তার আঁচলের নিচে নিরাপদে ঘুমাতো। সময় যতই এগিয়ে যাক, মায়ের জায়গা কেউ নিতে পারে না—না কেউ পারে সেই ভালোবাসার বিকল্প হতে, না সেই নির্ভরতার।
তবুও জীবন এগিয়ে যায়। মানুষ বাঁচে, স্বপ্ন দেখে, দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু গভীর রাতে যখন সব শব্দ থেমে যায়, তখন মায়ের অভাব সবচেয়ে জোরে কথা বলে। সেই নীরব ডাক—যেটা কেউ শোনে না, কিন্তু হৃদয় ঠিকই অনুভব করে।
মা-বিহীন ২০ বছর শুধু একটি সময়কাল নয়, এটি একটি জীবনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘ এক নীরব ইতিহাস। যেখানে কান্না নেই দৃশ্যমান, কিন্তু অনুভূতি আছে প্রবল। যেখানে শূন্যতা আছে, কিন্তু স্মৃতির আলোও আছে। সেই আলোই হয়তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে—মাকে না পেয়েও মাকে বুকে ধারণ করে।
লেখকঃ প্রাবন্ধিক

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

পূর্বের নিউজ দেখুন

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

আজকের সর্বশেষ সংবাদ