আজ : রবিবার ║ ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : রবিবার ║ ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ║ ১৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

জলজটের নামান্তরে জলাবদ্ধতা : নগরবাসীর দুর্ভোগ

আবদুল্লাহ মজুমদার

টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগর আবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মুখে পড়ে। মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, শোলকবহর, বহদ্দারহাট, চকবাজার থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকার আশপাশ—বহু এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে, চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ।
বিশেষ করে প্রবর্তক মোড়সহ কয়েকটি এলাকার জলাবদ্ধতার চিত্র সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে উঠে আসে। দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগও পাওয়া যায়। স্থানীয়দের মতে, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার ফল।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি শব্দ—“জলজট”। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই শব্দ ব্যবহার করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা হলেও, নাগরিকদের একটি বড় অংশ একে “জলাবদ্ধতা”রই ভিন্ন নাম হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, শব্দের পরিবর্তনে বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন ঘটে না।

আসলে ‘জলাবদ্ধতা’ বলতে বোঝানো হয় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত না হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নগর এলাকায় জমে থাকার অবস্থা। আর ‘জলজট’ শব্দটি তুলনামূলকভাবে নতুন ব্যবহৃত হলেও একই সমস্যারই ভিন্ন ভাষ্য। ফলে শব্দগত ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি একই থেকে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। এটি বহু বছরের একটি কাঠামোগত সংকট। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সিটি কর্পোরেশনসহ একাধিক সংস্থার দায়িত্ব থাকলেও কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি বারবার সামনে এসেছে। সিডিএ জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় বড় প্রকল্প গ্রহণের কথা বললেও তার দৃশ্যমান সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

খাল পুনঃখনন, ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হয়েছে—তা নিয়ে জনমনে অসন্তোষ রয়েছে। অনেকের মতে, কেবল প্রকল্প গ্রহণ নয়, প্রয়োজন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কঠোর জবাবদিহি।

অন্যদিকে প্রশাসনিক বক্তব্য ও বাস্তব চিত্রের মধ্যে ব্যবধান নাগরিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। একদিকে পরিস্থিতিকে “জলজট” বলা হচ্ছে, অন্যদিকে মানুষ বাস্তবে জলাবদ্ধতার ভয়াবহ ভোগান্তির মুখোমুখি হচ্ছে।

চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা—শব্দের ব্যাখ্যা নয়, সমস্যার কার্যকর সমাধান। সিডিএ, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা বা জলজট—যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, এটি এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী নগর সংকট। এর সমাধানে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা। নইলে বর্ষা এলেই চট্টগ্রাম আবারও একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি দেখতে বাধ্য হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

আজকের সর্বশেষ সংবাদ