
দেশচিন্তা ডেস্ক: চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও রাউজানে বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপপ্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি সৃষ্টির করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চক্রান্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া তাদের স্কুল-কলেজে হামলারও পরিকল্পনা ছিল।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ। তিনি বলেন, বসতঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গত ২ জানুয়ারি রাঙামাটি থেকে মনির নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে আরো ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে কেরোসিন, ডিজেল, সিএনজি, মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। তারা নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য। তবে কোন সংগঠনের সদস্য- তা পরিষ্কার করেননি তিনি।
গ্রেপ্তারা হলেন মনির হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ কবির হোসেন. কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া , মোহাম্মদ লোকমান ও মো. পারভেজ। এর মধ্যে লোকমান রাঙামাটি পৌরসভার কাউন্সিলর বলে জানা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি বলেন, গত ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকার বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে হিন্দু, বৌদ্ধ, পাহাড়ি ও একটি মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ে যায়।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে তৈরি ব্যানার উদ্ধার করে যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক বক্তব্য, কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম এবং অর্ধশতাধিক মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়। এরপর থেকে পুলিশ ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ শুরু করে।
ডিআইজি আরো বলেন, গত ২ জানুয়ারি রাঙামাটি থেকে মনির নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তার বসতঘর তল্লাশি করে তিনটি খালি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়, যা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার ব্যানারের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রাঙ্গামাটি পৌরসভার সাবেক কমিশনার লোকমান ও রাউজানের একজন ব্যক্তির পরিকল্পনায় ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও বৌদ্ধদের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতঘরে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
পাশাপাশি জনমনে বিভ্রান্তি ও ভীতি সৃষ্টির লক্ষে ষড়যন্ত্রমূলক ব্যানার টানিয়ে রাখে।
ডিআইজি বলেন, গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আমরা বিভিন্ন রকমের তথ্য পেয়েছি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই এর প্রমাণ করা। বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিরাপদ নয়- তা প্রমাণ করা, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। জাতীয় নির্বাচনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল তাদের। কারণ এই জনগোষ্ঠী যদি নিরাপদ না থাকে তাহলে তারা ভোটের পরিবেশ পাবে না।
ডিআইজি আরো বলেন, আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমরা জানতে পেয়েছি, তাদের পরিকল্পনা ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া। এছাড়া তাদের আরো বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা ছিল, যা এই মুহূর্তে আমরা প্রকাশ করব না। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সদস্য রয়েছেন । গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুই একজন সদস্য রয়েছেন, যারা ভাবছেন এই কার্যক্রমগুলো করার মাধ্যমে দেশে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাদের অনেক নেতানেত্রী দেশে ফেরার সুযোগ পাবেন। এখানে যারা মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থলগ্নিকারী বাস্তবায়নকারী- সবারই তথ্য আমরা পেয়েছি। তবে সবাইকে আমরা গ্রেপ্তার করতে পারিনি। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এই পরিকল্পনায় গ্রেপ্তারের বাইরে আরো কতজন রয়েছে জানতে চাইলে ডিআইজি বলেন, ১০-১২ জন রয়েছে, যাদেরকে আমরা এখনো গ্রেপ্তার করতে পারিনি।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের হামলার পরিকল্পনা ছিল জানিয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, যদি আমরা তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারতাম, তাহলে এ রকম একটা কাজ তারা করত। মূলত মিডিয়া ফোকাস পাওয়ার জন্য।
জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও ঘটনায় সক্রিয় নেতৃত্ব দেওয়া একজনের নাম পাওয়া যায়, যিনি স্থানীয় নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এ ছাড়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সমন্বয়কারী হিসেবে রাঙামাটিতে বসবাসকারী একজনের নাম পাওয়া গেছে। তিনি অন্য সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ, ঘটনাস্থলে যাতায়াত ও সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে অগ্নিসংযোগের ঘটনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছেন।
উল্লেখ, রাউজান পৌরসভার সুলতানপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে গত ২৩ ডিসেম্বর ভোরে একটি বসতঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বাড়িটি কাতার প্রবাসী সুখ শীল নামের এক ব্যক্তির। আগুনে পুড়ে যাওয়া বাড়ির কাছ থেকে পুলিশ হাতে লেখা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনের ব্যক্তিদের নাম ও মোবাইল নম্বর লেখা ব্যানার জব্দ করে। এর আগে গত ২০ ডিসেম্বর ভোর রাতে একইভাবে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ঢেউয়াপাড়া এলাকায় বিমল তালুকদার ও রুবেল দাশ নামে দুই ব্যক্তির বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়।
এর আগে ১৯ ডিসেম্বর ভোররাতে কেউটিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডে সাধন বড়ুয়া ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সোনা পাল ও কামিনী মোহন পালের বসতঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই দিনও উঠান থেকে কেরোসিন মেশানো কাপড়, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সরকারের ঊর্ধ্বতনদের নাম ও মোবাইল নম্বর লেখা কাগজ উদ্ধার করে পুলিশ।











