আজ : মঙ্গলবার ║ ১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ : মঙ্গলবার ║ ১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║২৭শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ║ ২৮শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

শিকড়ের টানে শুদ্ধতার জয়গানে মৌয়াল রানী ও ‘আহরোণ’

অভিলাষ মাহমুদ
বর্তমান সময়ের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে আমাদের থালায় সাজানো বাহারি খাবারের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক ভয়াবহ আতঙ্ক— ভেজাল। যখন বাজারভর্তি চকচকে সব পণ্যের ভিড়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ, ঠিক তখনই এক সাহসী নারী আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি মেহেরুন নেছা শাহেলী। গত সাত বছর ধরে যিনি কেবল ব্যবসা নয়, বরং বাংলার হারানো খাদ্য ঐতিহ্য ও ভেষজ সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারে লিপ্ত এক নিরলস যোদ্ধা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘আহরোণ’ আজ কেবল একটি ব্র্যান্ড নয়, বরং কয়েক হাজার মানুষের কাছে বিশুদ্ধতার এক আস্থার নাম।
শুরুর গল্প: বিলাসিতা ছেড়ে ধুলোমাখা পথে
মেহেরুন নেছা শাহেলীর যাত্রাটা মসৃণ ছিল না। চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনি যোগ দিয়েছিলেন শিক্ষকতা পেশায়। কলেজের প্রভাষক হিসেবে একটি নিশ্চিত ও সম্মানজনক জীবন তাঁর সামনে ছিল। কিন্তু অন্তরের গহীনে কাজ করছিল অন্য এক তাড়না। শৈশবে দেখা বাংলার সেই আদি খাদ্যের স্বাদ আর বর্তমানের রাসায়নিকযুক্ত খাবারের তফাৎ তাঁকে ব্যথিত করত।
অবশেষে সেই নিরাপদ জীবনের মায়া কাটিয়ে তিনি নামলেন অনিশ্চিত কিন্তু স্বপ্নের পথে। শিক্ষকতার মার্জিত কক্ষ ছেড়ে তিনি বেছে নিলেন বাংলার ধুলোমাখা পথ, চরের তপ্ত বালু আর সুন্দরবনের গহিন অরণ্য। যে সময় নারীরা কর্পোরেট অফিসে ক্যারিয়ার গড়তে ব্যস্ত, শাহেলী তখন প্রান্তিক কৃষক আর মৌয়ালদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন খাঁটি উপাদানের সন্ধানে। সুন্দরবনের মৌয়ালরা তাদের আঞ্চলিক টানে ‘আহরণ’ শব্দটিকে উচ্চারণ করত ‘আহরোণ’ বলে। শ্রমজীবী মানুষের সেই সহজ-সরল উচ্চারণকে সম্মান জানিয়েই তিনি তাঁর উদ্যোগের নাম রাখেন— আহরোণ।
‘মৌয়াল রানী’ ও ‘প্রকৃতি কন্যা’: মাঠপর্যায়ের নিরলস যোদ্ধা
শাহেলীর কাজের ধরণ সাধারণ উদ্যোক্তাদের চেয়ে একদম আলাদা। তিনি কেবল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে অর্ডার নেন না; বরং মৌয়ালদের টিম নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার দুর্গম প্রান্তে ছুটে যান নিজে মধু সংগ্রহের জন্য। সুন্দরবনের গহিন অরণ্য থেকে শুরু করে সরিষা কিংবা লিচু ফুলের মাঠ— সবখানেই তাঁর সরব উপস্থিতি। মধু সংগ্রহের প্রতিটি ধাপে তাঁর এই সরাসরি অংশগ্রহণ এবং প্রকৃতির প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে অনলাইনে তাঁর গ্রাহক ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘মৌয়াল রানী’ ও ‘প্রকৃতি কন্যা’। মাঠপর্যায়ের এই কঠোর পরিশ্রমই আহরোণের প্রতিটি মধু ও ভেষজ পণ্যের বিশুদ্ধতার প্রধান গ্যারান্টি।
অঙ্গীকার যেখানে পাহাড়সম
দীর্ঘ সাত বছরের পথচলায় শাহেলী খুব কাছ থেকে দেখেছেন কীভাবে বাণিজ্যিক লাভের আশায় আমাদের প্রকৃত খাদ্য ব্যবস্থায় বিষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় তাঁর ইস্পাতকঠিন অঙ্গীকার— বাংলার হারিয়ে যাওয়া আদি খাদ্য ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনা। তিনি বিশ্বাস করেন, “শূন্য থেকেও স্বপ্ন গড়া যায়,” আর সেই বিশ্বাসের শক্তি নিয়েই আজ তিনি বিশুদ্ধ ও প্রাকৃতিক খাদ্যপণ্যের একজন বিশ্বস্ত বাহক।
আহরোণ: ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার কেন্দ্র
আহরোণ কেবল পণ্য বিক্রি করে না, বরং কাজ করে বাংলার প্রকৃতি ও ভেষজ ঐতিহ্য নিয়ে। শাহেলীর নেতৃত্বে আহরোণের মূল লক্ষ্য চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে:
১. আদি খাদ্যের পুনরুদ্ধার: প্রাচীন বাংলার যেসব খাবার আজ বিলুপ্তপ্রায়, সেগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
২. ভেজালমুক্ত সচেতনতা: কেবল পণ্য পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং সাধারণ মানুষকে ভেজালের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা।
৩. সঠিক তথ্য প্রদান: খাদ্যের গুণাগুণ ও ঔষধি গুরুত্ব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক তথ্য সরবরাহ করা।
৪. নিজস্ব তত্ত্বাবধান: প্রতিটি পণ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে শাহেলীর সরাসরি উপস্থিতি ও পর্যবেক্ষণ।
দাম্পত্য আচার: এক অনন্য ভেষজ বিপ্লব
আহরোণের সবচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় উদ্ভাবন হলো ‘দাম্পত্য আচার’। এটি কেবল একটি মুখরোচক আচার নয়, বরং দীর্ঘ ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় তৈরি একটি ওষুধি পরিপূরক। শাহেলী জানান, একটি মানসম্মত ভেষজ আচার তৈরি করতে তাঁদের অনেকগুলো কঠিন ধাপ পেরোতে হয়। বিরল ও ঔষধি শেকড়, বীজ এবং লতা প্রাকৃতিক উপায়ে প্রস্তুত করে নির্দিষ্ট অনুপাতে এই আচার তৈরি করা হয়। শাহেলীর বিশেষত্ব হলো— তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ সম্পূর্ণ কাঁচা অবস্থায় আচারে মিশ্রিত করেন, যাতে তাদের প্রাকৃতিক গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং হরমোন ভারসাম্য বজায় রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।
চরের ঘাস আর বিশুদ্ধ ঘি: আপসহীন যাত্রা
আহরোণের গব্য ঘি’র স্বাদ ও ঘ্রাণ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এর পেছনের রহস্য হলো শাহেলীর কঠোর নজরদারি। তিনি চরের মুক্ত পরিবেশে প্রাকৃতিক ঘাস খাওয়া গরুর দুধ সংগ্রহ করেন। কোনো কৃত্রিম খাদ্য বা ইনজেকশন দেওয়া গরুর দুধ আহরোণের তালিকায় স্থান পায় না। নিজস্ব উপস্থিতিতে প্রস্তুত করা এই ঘি ঐতিহ্যের সেই আদি স্বাদকে মনে করিয়ে দেয়।
স্বপ্ন যখন দিগন্ত বিস্তৃত
সাফল্যের সাত বছর পেরিয়ে শাহেলীর স্বপ্ন এখন আরও বড়। তাঁর স্বপ্ন একটি ‘ঐতিহ্যবাহী গ্রাম’ গড়ে তোলা। যেখানে যান্ত্রিকতার ছোঁয়া থাকবে না; মানুষ দেখবে কীভাবে ঘানিতে তেল ভাঙানো হয়, কীভাবে ঢেঁকিতে ধান ভানা হয়। মানুষ সেখানে ফিরে পাবে তাদের আদি শেকড়কে।
মেহেরুন নেছা শাহেলী প্রমাণ করেছেন, সততা আর নিরলস পরিশ্রম থাকলে যেকোনো কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব। আজ তিনি হাজারো নারীর অনুপ্রেরণা। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি রোগমুক্ত ও সুস্থ জীবন উপহার দিতে শাহেলীর মতো এমন ‘বিশুদ্ধতার কারিগর’ আজ ঘরে ঘরে প্রয়োজন।
যোগাযোগ: শুদ্ধতার এই মিছিলে সামিল হতে এবং বাংলার ঐতিহ্যকে নিজের আঙিনায় পেতে যোগাযোগ করুন: ০১৮৩৬-৪৩২৭৪৮ (আহরোণ – বিশুদ্ধতার এক আস্থার নাম)
লেখক : কবি , সাংবাদিক ও গাল্পিক

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

পূর্বের নিউজ দেখুন

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

আজকের সর্বশেষ সংবাদ