
এনামুল হক
নদী ও মানুষ আবহমান কাল থেকেই একে অপরের পরিপূরক। আড়াইহাজার ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য হাড়িধোয়া নদী কেবল একটি জলধারা নয়, বরং এটি ছিল আমাদের ঐতিহ্যের বাহক এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। একসময় গোপালদী থেকে শান্তির বাজার পর্যন্ত এই নদীপথ দিয়ে বড় বড় নৌযান চলত, ব্যবসা-বাণিজ্য চলত পুরোদমে। কিন্তু আজ সেই খরস্রোতা হাড়িধোয়া নদী নিথর, নিস্তব্ধ এবং মুমূর্ষু। দখলদারিত্ব আর দূষণের করাল গ্রাসে নদীটি এখন মৃতপ্রায়।
১. নদী দখল ও দূষণের ভয়াবহ চিত্র
বর্তমানে হাড়িধোয়া নদীর দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও শিল্প-কারখানা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদীটিকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে গিলে খাচ্ছে। শুধু দখলই নয়, নদীটি এখন এলাকার ‘ডাস্টবিনে’ পরিণত হয়েছে। গৃহস্থালির বর্জ্য থেকে শুরু করে কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানি এখন আলকাতরার মতো কালো এবং দুর্গন্ধযুক্ত। এতে মাছসহ জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
২. নদী রক্ষায় আইনি বাধ্যবাধকতা
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ (Living Entity) হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর অর্থ হলো, একজন মানুষের যেমন আইনি অধিকার আছে, একটি নদীরও তেমন অধিকার আছে। নদী রক্ষায় আমাদের দেশে কঠোর আইন রয়েছে:
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩: এই আইন অনুযায়ী, নদীর জমি দখল বা নদী দূষণ করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। কমিশনকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যেকোনো অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়ার।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০): এই আইনের মাধ্যমে নদী বা জলাশয়ে বর্জ্য নিক্ষেপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এটি লঙ্ঘন করলে জেল ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
পাউবো আইন ও ভূমি আইন: নদীর সীমানা নির্ধারণী পিলারের ভেতরে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ এবং তা ফৌজদারি অপরাধের শামিল।
হাড়িধোয়া নদীর ক্ষেত্রে এই আইনগুলোর প্রয়োগ আমরা কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। প্রশাসনের চোখের সামনে নদীটি তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
৩. পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব
নদী মারা গেলে শুধু পানি শুকায় না, একটি জনপদের প্রাণস্পন্দনও থেমে যায়। হাড়িধোয়া নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বর্ষাকালে এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। কৃষিকাজে সেচের পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। এছাড়া, একসময় যে সস্তা নৌপথ ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণ, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনের খরচ ও ভোগান্তি দুটোই বেড়েছে।
৪. আমাদের দাবি ও করণীয়
হাড়িধোয়া নদীকে বাঁচাতে হলে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাভ নেই, প্রয়োজন পরিকল্পিত ও কঠোর পদক্ষেপ। আমরা প্রশাসনের কাছে নিম্নলিখিত দাবিগুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করছি:
1. সীমানা নির্ধারণ ও উচ্ছেদ: সিএস এবং আরএস ম্যাপ অনুযায়ী হাড়িধোয়া নদীর প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত করতে হবে এবং নদীর ভেতরে থাকা সকল অবৈধ স্থাপনা কোনো প্রকার আপস ছাড়াই উচ্ছেদ করতে হবে।
2. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পৌরসভা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট ডাম্পিং জোন তৈরি করতে হবে যাতে কেউ নদীতে ময়লা না ফেলে। কলকারখানায় ইটিপি (Effluent Treatment Plant) ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
3. নদী খনন (Dredging): দখলমুক্ত করার পর নদীটিকে পুনরায় খনন করে এর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে সারা বছর পানি প্রবাহ থাকে।
4. জনসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন: নদীকে ভালোবাসার দায়বদ্ধতা আমাদের সবার। স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে হবে যেন তারা নদী রক্ষায় প্রহরীর ভূমিকা পালন করে।
৫. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা
আমরা যদি আজ চুপ করে থাকি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তারা কোনোদিন জানতেই পারবে না যে, এখানে একসময় স্বচ্ছ পানির হাড়িধোয়া নদী বয়ে যেত। নদী রক্ষা করা মানে কেবল ভূখণ্ড রক্ষা নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করা।
হাড়িধোয়া নদী আজ বিপন্ন, কিন্তু একে এখনো বাঁচানো সম্ভব। প্রয়োজন শুধু প্রশাসনের সদিচ্ছা এবং স্থানীয় জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ। আমরা চাই প্রশাসন অতি দ্রুত ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’ এবং স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করুক। আসুন, দল-মত নির্বিশেষে সবাই মিলে আমাদের প্রাণপ্রিয় হাড়িধোয়া নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করি।
নদী বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচলে আমরা বাঁচব।
















