বিবি শাহীজান
গণপরিবহন ও লিঙ্গসংবেদনশীলতা কেবল কোনো একক যাতায়াত ব্যবস্থার বিষয় নয়, বরং এটি একটি সমাজের সার্বিক মানসিকতার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের জন্য পৃথক 'পিংক বাস' বা বিশেষ পরিবহন চালুর উদ্যোগ দেখা গেলেও, মূল সমস্যার গভীরে না গিয়ে ওপর ওপর প্রলেপ দেওয়ার এই প্রবণতা টেকসই কোনো সমাধান আনছে না। একটি আধুনিক, নিরাপদ ও কল্যাণমুখী সামাজিক কাঠামো তৈরিতে গণপরিবহনের সংস্কার এবং পুরুষের মানসিকতার পরিবর্তন কীভাবে জরুরি, তা কয়েকটি মূল দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সমস্যার মূল গোড়াপাত ঘটে আমাদের সামাজিক পরিবার ও মানসিকতায়। প্রতিটি ছেলেসন্তানকে ছোটবেলা থেকেই এই শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন যে, নারী কোনো ভোগের বস্তু বা দুর্বল সত্তা নয়—তিনিও একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ এবং সমঅধিকারের দাবিদার। জনপরিসরে বা গণপরিবহনে একজন নারী যখন চলাচল করেন, তখন তিনি যে কোনো করুণা বা দয়া পাচ্ছেন না, বরং একজন নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার চর্চা করছেন—এই বোধটুকু পুরুষদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা অপরিহার্য।
পৃথক বাস সার্ভিস চালু করার চেয়ে বেশি জরুরি প্রতিটি সাধারণ বাসকে সর্বস্তরের নারী, শিশু ও প্রবীণদের জন্য নিরাপদ এবং 'নারীবান্ধব' হিসেবে গড়ে তোলা।
ড্রাইভারদের বেপরোয়া ও আগ্রাসী মনোভাব কেবল দুর্ঘটনার ঝুঁকিই বাড়ায় না, বরং নারী যাত্রীদের জন্য এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করে। সড়ক ও পরিবহনে এই আগ্রাসন কঠোর হাতে দমন করতে হবে।
বাসে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি, বাসের ভেতরে ড্রাইভারের হাতের বাম পাশে ইঞ্জিনের ওপরের আসনগুলো কোনোভাবেই নারীবান্ধব নয়। এগুলো প্রচণ্ড গরম, ঝাঁকুনিপূর্ণ এবং যেকোনো দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই ধরনের নকশাগত ত্রুটি দূর করা জরুরি।
আলাদা করে কৃত্রিম ব্র্যান্ডিং না করে, বর্তমান রুটগুলোতে সচল থাকা বাস থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট অংশকে বিশেষ ক্যাটাগরির জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে। যেমন—কোনো রুটে ১০০টি বাস চললে সেখান থেকে ১০টি বাসকে নারী, প্রবীণ ও শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জড যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত করা যায়। এতে প্রতি ২০ বা ৩০ মিনিট অন্তর প্রতিটি রুটেই সব শ্রেণীর মানুষ প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার পাবে।
বর্তমানে চালু হওয়া পিংক কালারের বাসগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, অবকাঠামোগত কোনো বড় পরিবর্তন না এনে স্রেফ ওপর থেকে রঙের প্রলেপ দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফিটনেস ও নিরাপত্তার দিক থেকে এগুলো যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ।
এই পিংক বাসগুলো প্রতিবন্ধী বা শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জড নারীদের চলাচলের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। হুইলচেয়ার নিয়ে ওঠা-নামা করার মতো প্রয়োজনীয় র্যাম্প, নিচু ধাপ (Low-floor) বা বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অভাব রয়েছে এসব বাসে।
এই অপরিকল্পিত বাসগুলোকে এভাবে লোকদেখানো হিসেবে না চালিয়ে বরং ভালোভাবে মেরামত করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের 'স্কুল বাস' হিসেবে হস্তান্তর করা যেতে পারে, যা শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতে কাজে আসবে।
রঙিন বাস কিংবা চোখধাঁধানো আয়োজনের চেয়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ট্রাফিক আইন ও পরিবহনে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।
লক্কড়ঝক্কড় ও ত্রুটিপূর্ণ বাস দূর করা, নির্দিষ্ট স্টপেজে থামা এবং সুশৃঙ্খলভাবে লাইন ধরে যাত্রী উঠানামা করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
ঢাকার হাতিরঝিলে যেভাবে নির্দিষ্ট কাউন্টার, লাইন ধরে বাস ধরা এবং সুনিয়ন্ত্রিত গতিসীমায় পরিবহন চালানো হয়, সেই ব্যবস্থার প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা অভিজ্ঞতা পুরো শহরের মূল গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা যেতে পারে।
একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে রং পাল্টানো নয়, বরং গণপরিবহনের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের পুরুষ মানসিকতার মৌলিক পরিবর্তনই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ ইমরান সোহেল। মোবাইল : ০১৮১৫-৫৬৩৭৯৪ । কার্যালয়: ৪০ কদম মোবারক মার্কেট, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম। ইমেল: [email protected]
Copyright © 2026 Desh Chinta. All rights reserved.