নাঈমুল মাসুম
৪৮টি দেশের বিশাল ক্যানভাসে সাজানো ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল স্রেফ খেলার সীমানা পেরিয়ে এক দারুণ সামাজিক ও কৌশলগত রূপান্তরের গল্প হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। ইউরোপীয় ফুটবল বিজ্ঞানের অতি-আধুনিকতা আর লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যগত পরাক্রমের উল্টো পিঠে এবার উদযাপিত হয়েছে আফ্রিকার নিখুঁত কৌশলগত বিপ্লব। অন্যদিকে, প্রযুক্তির ব্যবহার সত্ত্বেও বিতর্কিত রেফারিং, ক্ষমতার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং অভিজ্ঞ কোচদের ট্যাকটিকাল দেউলিয়াত্ব এই আসরকে করেছে যেমন নাট্যময়, তেমনই প্রশ্নবিদ্ধ।
টুর্নামেন্ট জুড়ে রেফারিংয়ের মান নিয়ে থেকে গেছে বিশাল প্রশ্নচিহ্ন। বিশেষ করে মিশর ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠের রেফারির সিদ্ধান্তগুলো খেলার স্বাভাবিক গতিকে দারুণভাবে ব্যাহত করে। স্পষ্ট ফাউল এবং পেনাল্টির আপিল সত্ত্বেও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি তথা ভিএআর-এর রহস্যময় নীরবতা ও রেফারির একপেশে অবস্থান ফুটবলপ্রেমীদের চরম হতাশ করেছে। একই প্রযুক্তি ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচে ভিন্ন মানদণ্ডে প্রয়োগ হওয়ার ফলে মাঠের খেলোয়াড় ও কৌশলবিদদের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র অনিশ্চয়তা। আধুনিক ফুটবলকে কলঙ্কমুক্ত করতে আনা এই ভিডিও প্রযুক্তির এমন দ্বিমুখী আচরণ আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকেই বড় ধরনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
ফুটবলের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি রক্ষায় ফিফা সবসময় উচ্চবাচ্য করলেও স্বাগতিক ভূখণ্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অহেতুক প্রশাসনিক প্রভাব ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত দৃশ্যমান। বিশেষ করে ইরান দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নজিরবিহীন সূচি ও মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় যাতায়াতের ভ্রমণ-যন্ত্রণা ক্রীড়াবিশ্বে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। তবে ক্রীড়া পরাশক্তিগুলোর এই মনস্তাত্ত্বিক চাপকে অনেকেই দেখছেন মার্কিন প্রশাসনের কূটনীতির এক সূক্ষ্ম চাল হিসেবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতায় ইরানকে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত রাখার এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ছক ফিফার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভিসা নীতি থেকে শুরু করে ম্যাচের স্থান নির্বাচন—সবকিছুর পেছনেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল বিশ্ব ফুটবলের ওপর স্বাগতিক দেশের আধিপত্য বিস্তারের মনস্তাত্ত্বিক খেলা।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি রচিত হয়েছিল ডাগ আউটের ভুল সিদ্ধান্তে। আধুনিক ফুটবলের দ্রুতলয় এবং ডাটা-ভিত্তিক বিশ্লেষণের যুগে দাঁড়িয়ে জার্মানি ও ব্রাজিলের মতো চার ও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় ছিল তাদের কোচদের ট্যাকটিকাল ভুলের খতিয়ান। পজেশন ভিত্তিক ফুটবলের প্রতি অন্ধ ভালোবাসাই জার্মানদের কাল হয়ে দাঁড়ায়। কোচের ছক ছিল অত্যন্ত অনুমেয় এবং কার্যকর স্ট্রাইকারের অভাবে তা ভেস্তে যায়। অন্যদিকে ব্রাজিলের মূল সমস্যা ছিল মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের মধ্যকার বিশাল শূন্যতা। উইংনির্ভর অতি-আক্রমণাত্মক মানসিকতা দেখাতে গিয়ে কোচ মাঝমাঠের লাগাম ছেড়ে দেন প্রতিপক্ষের হাতে। সেলেসাওদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফুটবল নকআউট পর্বে প্রতিপক্ষের সুসংগঠিত ডিফেন্স ব্লকের সামনে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে পড়ে।
ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর বিদায়ের খালি জায়গায় নিজেদের নাম প্রদীপ্ত অক্ষরে খোদাই করে নিয়েছে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। সুশৃঙ্খল ডিফেন্সিভ শেপ, ক্ষুরধার প্রতিআক্রমণ এবং অদম্য শারীরিক সক্ষমতার মেলবন্ধনে এবার আফ্রিকান দেশগুলো বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কেপ ভার্দে, মরক্কো ও সেনেগালের মতো দলগুলো প্রমাণ করেছে যে ফুটবলে এখন আর তথাকথিত ক্ষুদ্র বা বৃহৎ বলে কিছু নেই। বিশেষ করে মহাদেশের অন্যতম ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র কেপ ভার্দে তাদের গতিময় ও সংক্ষিপ্ত পাসের ফুটবলে বিশ্বকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। সুসংগঠিত প্রেস ব্লক ব্যবহার করে তারা বিশ্বসেরা হেভিওয়েট দলগুলোর বিল্ড-আপ প্লে সম্পূর্ণ পণ্ড করে দেয়।
তবে এই আফ্রিকান বিপ্লবের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও রোমাঞ্চকর উপাখ্যান রচিত হয়েছে গোলপোস্টের নিচে। বিশেষ করে কেপ ভার্দোর অভিজ্ঞ রক্ষক জোসিমার হোসে এভোরা দিয়াস, যিনি বিশ্বব্যাপী 'ভোজিনিয়া' (নামে পরিচিত, এবং মরক্কোর নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো, ফুটবল বিশ্বে যিনি 'বোনো' নামে খ্যাতি লাভ করেছেন—এই দুজনের অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। কেপ ভার্দোর ভোজিনিয়া যেন পোস্টের নিচে এক অভেদ্য মানবপ্রাচীর গড়ে তুলেছিলেন। একের পর এক অসম্ভব সেভ, প্রতিপক্ষের পাওয়ার শট আটকে দেওয়া এবং পেনাল্টি শুটআউটে তাঁর বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়া বিশ্বফুটবলকে এক নতুন চমক উপহার দিয়েছে।
একইভাবে মরক্কোর বিখ্যাত গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো বা বোনোর ম্যাচ রিডিং এবং গোলপোস্ট ছেড়ে বের হয়ে আসার নিখুঁত টাইমিং ছিল রূপকথার মতো। প্রতিপক্ষের সেটপিস কিংবা দূরপাল্লার শট ঠেকানোর ক্ষেত্রে তাঁর চটপটে সিদ্ধান্ত এবং আত্মবিশ্বাস পুরো মরক্কো ডিফেন্সকে দিয়েছিল হিমালয়সম ভরসা। একের পর এক কঠিন খেলায় ক্লিনশিট বজায় রেখে এবং চরম চাপের মুহূর্তে পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি একক হাতে দলকে নিয়ে গেছেন সাফল্যের চূড়ায়। সেনেগালের কৌশলগত পরিপক্বতার সাথে ভোজিনিয়া ও বোনোর এই কালজয়ী পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে যে আফ্রিকার ফুটবল এখন আর স্রেফ শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং পোস্টের নিচ থেকেও তারা বিশ্ব শাসন করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
দলীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি এই আসর ব্যক্তিগত অর্জনের এক অনন্য মঞ্চ প্রস্তুত করেছিল। মাঝমাঠের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে স্পেনের রোদ্রি টুর্নামেন্টের গতিপথ নির্ধারণ করে জয় করে নেন সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল। ফ্রান্স সেমিফাইনালে বিদায় নিলেও ৮ ম্যাচে ১০ গোল করে কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজের করে নেন গোল্ডেন বুট। অন্যদিকে পুরো আসরে ৬৫০ মিনিট অপরাজিত থেকে এবং ৭টি ম্যাচে ক্লিন শিট রেখে স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন নিজের ঝুলিতে পুরেন গোল্ডেন গ্লাভ।
ট্যাকটিকাল ফুটবলের অনন্য পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত অধরা ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে স্পেন। স্প্যানিশদের এই অপরাজিত যাত্রা ও বিশ্বজয় আধুনিক ফুটবলের এক নিখুঁত নজির গড়েছে। অন্যদিকে লাতিন পরাশক্তি আর্জেন্টিনা গত চার বিশ্বকাপের তিনটিতেই ফাইনালে ওঠার অবিশ্বাস্য ও অনন্য ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেও, এই আসরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক বেদনাবিধুর মুহূর্ত। সমস্ত আক্ষেপ, স্মৃতি আর জাদুকরী অধ্যায়ের ইতি টেনে অবশেষে নীল-সাদা জার্সি গায়ে লিওয়েল মেসির অশ্রুজলে শেষ হলো বিশ্বকাপ। বিশ্বমঞ্চ থেকে এই প্রস্থান কোটি কোটি সমর্থকের হৃদয়কে সিক্ত করলেও এটিই সত্য যে, নিজের অনবদ্য কাব্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন—মেসি এই শতাব্দীর ফুটবলের জাদুকর। ট্রফি বিজয়ের আনন্দ কিংবা হারের করুণ সুর ছাপিয়ে ফুটবল প্রেমীদের হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে এক নতুন ভোর ও এক চিরন্তন জাদুকরের নাম।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ ইমরান সোহেল। মোবাইল : ০১৮১৫-৫৬৩৭৯৪ । কার্যালয়: ৪০ কদম মোবারক মার্কেট, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম। ইমেল: [email protected]
Copyright © 2026 Desh Chinta. All rights reserved.