চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে যুবক হাসান রাজুকে হত্যার ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ১২ বছরের শিশু রেশমি আক্তারের মৃত্যুতে নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাউজানের সন্ত্রাসী দ্বন্দ্ব ও প্রতিশোধপরায়ণ সহিংসতা নগরীতেও ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—রাউজানের সংঘাতের বলি কেন হবে নগরীর নিরীহ মানুষ ও নিষ্পাপ শিশু?
গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে নগরীর বায়েজিদ বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনির একটি সরু গলিতে মুখোশধারী পাঁচ থেকে ছয়জন অস্ত্রধারী হাসান রাজুকে ধাওয়া করে। পালানোর একপর্যায়ে রাজু মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা তাকে পা দিয়ে চেপে ধরে মাথায় গুলি করে হত্যা করে। এ সময় এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে গুলিবিদ্ধ হয় শিশু রেশমি আক্তার। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, চার থেকে পাঁচ মিনিট ধরে টানা গুলির শব্দে পুরো এলাকা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অস্ত্রধারীদের ভয়ে কেউ এগিয়ে যেতে সাহস পাননি। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় রাজু ও রেশমিকে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রিয়াজ-সাবেরা দম্পতির দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে রেশমি ছিল সবার ছোট। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রেশমি স্বভাবগতভাবে চঞ্চল হলেও প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যেত না। ঘটনার দিন তার মা ২০ টাকা দিয়ে তাকে পান আনতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু দোকানে পৌঁছানোর আগেই গুলির মধ্যে পড়ে যায় সে। মাথা ও চোখে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা আটদিন লাইফ সাপোর্টে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বৃহস্পতিবার সকালে আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তাসলিম উদ্দিন জানান, রেশমীর চোখের ভেতর দিয়ে গুলি ঢুকে মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ব্রেন ম্যাটার বের হয়ে আসায় এবং দীর্ঘদিন লাইফ সাপোর্টে থাকায় তার অস্ত্রোপচার সম্ভব হয়নি।
রেশমির ভাই ফয়সাল আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে? পুলিশকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি না।” বাবা রিয়াজ আহমেদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “মেয়েকে আর ফিরে পাব না। এভাবে আর কত নিরীহ মানুষ প্রাণ দেবে? জনগণকে নিরাপদ রাখবে কে?”
বায়েজিদ থানার ওসি আব্দুল করিম জানান, ময়নাতদন্ত শেষে রেশমির মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পুলিশ জানায়, গত ২৬ এপ্রিল রাউজান উপজেলার কদলপুর এলাকায় নাসির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনার জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। নিহত নাসিরের মেয়ে লাভলী আক্তার হাসান রাজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। নাসির ছিলেন প্রবাসফেরত ও যুবদলের কর্মী।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নাসির হত্যার প্রতিশোধ নিতেই নগরীতে রাজুকে হত্যা করা হয়। তদন্তে পলাতক সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হানের অনুসারীদের নামও উঠে এসেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাউজানের ফজলহক গ্রুপ ও সাজ্জাদ গ্রুপের বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। নাসির হত্যা মামলার পর রাজু নগরীতে আত্মগোপনে ছিলেন। পরে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা নগরে এসে তাকে হত্যা করে। তাদের ছোড়া গুলিতেই প্রাণ যায় নিষ্পাপ শিশু রেশমির।
একটি শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে রাউজানের সহিংসতা নগরীতে ছড়িয়ে পড়ায় চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক আরও গভীর হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ ইমরান সোহেল। মোবাইল : ০১৮১৫-৫৬৩৭৯৪ । কার্যালয়: ৪০ কদম মোবারক মার্কেট, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম। ইমেল: [email protected]
Copyright © 2026 Desh Chinta. All rights reserved.