রুমা খান
উচ্চ শিক্ষা আর সুশিক্ষা এক নয়—এই কথাটি যত সহজ শোনায়, বাস্তবে তার গুরুত্ব ততটাই গভীর। আধুনিক সমাজে আমরা শিক্ষা বলতে অধিকাংশ সময়ই বুঝি ডিগ্রি, সার্টিফিকেট, পরীক্ষার ফলাফল কিংবা পেশাগত সাফল্য। কিন্তু এর বাইরেও একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়—এই শিক্ষার ভেতরে মানুষ কতটা মানুষ হয়ে উঠছে?
আজকের বিশ্বে উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—সবকিছুই জ্ঞান অর্জনকে সহজ করে দিয়েছে। একজন শিক্ষার্থী চাইলেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের তথ্য নিজের হাতে তুলে নিতে পারে। এই দিক থেকে দেখলে, উচ্চ শিক্ষা নিঃসন্দেহে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখছে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই জ্ঞান মানুষের আচরণ, মূল্যবোধ কিংবা নৈতিকতায় প্রতিফলিত হয় না। একজন মানুষ হয়তো অনেক ডিগ্রিধারী, পেশাগতভাবে সফল—কিন্তু তার মধ্যে যদি সহানুভূতি, সততা, দায়বদ্ধতা বা মানবিকতা না থাকে, তবে সেই শিক্ষা সমাজের জন্য কতটা কার্যকর—এই প্রশ্ন থেকেই যায়।
সুশিক্ষা ঠিক এখানেই ভিন্ন। এটি কেবল বইয়ের জ্ঞান নয়; বরং মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার একটি প্রক্রিয়া। পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই একজন মানুষ সুশিক্ষিত হয়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকে যে শিশু অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা শেখে—সে বড় হয়ে কেবল সফলই নয়, মূল্যবান মানুষও হয়ে ওঠে।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। পরীক্ষার নম্বর, জিপিএ, ভর্তি প্রতিযোগিতা—এসবের ভিড়ে নৈতিক শিক্ষা অনেকটাই পেছনে পড়ে গেছে। ফলে আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা তথ্য জানে, কিন্তু মূল্যবোধে দুর্বল।
সমাজের নানা সমস্যার দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। দুর্নীতি, প্রতারণা, অসহিষ্ণুতা—এসবের পেছনে জ্ঞানের অভাব যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি অভাব সুশিক্ষার। একজন শিক্ষিত মানুষ যদি অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করে, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় বা নিজের স্বার্থে নৈতিকতা বিসর্জন দেয়—তাহলে তার শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সমাজের জন্য তা কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনে না।
অন্যদিকে, সুশিক্ষা একজন মানুষকে শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও দায়বদ্ধ করে তোলে। একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তি বুঝতে পারে তার কাজের প্রভাব অন্যদের ওপর কীভাবে পড়ে। সে অন্যের কষ্ট অনুভব করতে পারে, অন্যায়কে প্রতিরোধ করতে পারে এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারে।
এই কারণে বলা যায়, উচ্চ শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করে তোলে, কিন্তু সুশিক্ষা তাকে মানবিক করে তোলে। এই দুইয়ের সমন্বয়ই একটি পরিপূর্ণ মানুষ গঠনের জন্য প্রয়োজন। শুধু জ্ঞান থাকলে মানুষ যন্ত্রের মতো হয়ে যেতে পারে, আর শুধু আবেগ থাকলে সে বাস্তবতায় টিকে থাকতে পারে না।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ভারসাম্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে মানুষ ক্রমেই একা হয়ে পড়ছে, সামাজিক সম্পর্ক শিথিল হচ্ছে। এমন সময় সুশিক্ষা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও সংযোগের অনুভূতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
পরিবার এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুর প্রথম শিক্ষা আসে পরিবার থেকে। বাবা-মায়ের আচরণ, কথাবার্তা, মূল্যবোধ—এসবই শিশুর মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই শিক্ষাকে আরও সুসংহত করতে পারে, যদি তারা পাঠ্যসূচির পাশাপাশি নৈতিকতা ও মানবিকতার চর্চাকে গুরুত্ব দেয়।
শিক্ষকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞানদাতা নন, তিনি একজন আদর্শও। তার আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ শিক্ষার্থীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
একই সঙ্গে সমাজের সামগ্রিক পরিবেশও একটি বড় বিষয়। যেখানে অন্যায়কে সহ্য করা হয়, সেখানে সুশিক্ষা টিকে থাকা কঠিন। আবার যেখানে সততা ও ন্যায়কে মূল্য দেওয়া হয়, সেখানে সুশিক্ষা স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উচ্চ শিক্ষা ও সুশিক্ষা একে অপরের পরিপূরক হবে। যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু ভালো ফলাফল অর্জন করবে না, বরং ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত সমাজ টিকে থাকে মানুষের ওপর—ডিগ্রির ওপর নয়। একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষই একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে। আর সেই মানুষ তৈরি হয় সুশিক্ষার মাধ্যমে।
উচ্চ শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানের আলো দেয়, কিন্তু সুশিক্ষা সেই আলোকে সঠিক পথে ব্যবহার করতে শেখায়। এই দুইয়ের সমন্বয়ই একটি সুস্থ, মানবিক ও উন্নত সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ ইমরান সোহেল। মোবাইল : ০১৮১৫-৫৬৩৭৯৪ । কার্যালয়: ৪০ কদম মোবারক মার্কেট, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম। ইমেল: [email protected]
Copyright © 2026 Desh Chinta. All rights reserved.