দেশচিন্তা ডেস্ক: আবদুল্লাহ মজুমদার
মাহমুদুল হাসান নিজামী ছিলেন চট্টগ্রামের সাহিত্য অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম। তিনি শুধু একজন কবি নন, ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী, সংস্কৃতিমনা এবং মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী একজন আলোকিত মানুষ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে কবিতা ও সাহিত্যচর্চায় নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন।
কবি নিজামীর কবিতায় মানবতা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম এবং ধর্মীয় চেতনার মেলবন্ধন দেখা যায়। তিনি সহজ ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা এবং সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতেন। তাঁর কবিতার শব্দে ছিল গভীর অনুভূতির স্পর্শ, যা পাঠকের মনে এক ধরনের আবেগ ও চিন্তার জন্ম দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন—সাহিত্য শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং এটি মানুষের বিবেক জাগ্রত করার শক্তিশালী এক উপায়।
চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বিভিন্ন সাহিত্যসভা, কবিতা পাঠের আসর এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। নবীন কবি ও লেখকদের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ স্নেহ ও উৎসাহ। তিনি তাঁদের অনুপ্রাণিত করতেন সৃজনশীল চর্চায় এগিয়ে যেতে এবং সাহিত্যকে জীবনের অংশ করে তুলতে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, সজ্জন এবং উদার মনের মানুষ। তাঁর কথা ও আচরণে ছিল আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যের ছোঁয়া। যারা তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তারা সবাই তাঁর সৌম্য ব্যক্তিত্ব ও মানবিক আচরণে মুগ্ধ হয়েছেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর এই নিবেদন তাঁকে মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে দিয়েছে।
আজ কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্যকর্ম, চিন্তা ও আদর্শ চিরকাল বেঁচে থাকবে। তাঁর কবিতার পংক্তি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে মানবতা, নৈতিকতা ও সত্যের পথে চলতে। বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কবি নিজামীর স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন সত্যিকারের কবি কখনো হারিয়ে যান না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টির মাঝে, মানুষের হৃদয়ে এবং সময়ের পাতায়।
কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী ১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার কালাপানিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মাওলানা আবদুল্লাহ, যিনি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর মাতা ছিলেন মায়মুনা খাতুন। পরিবারসহ বসবাস করতেন রাজধানীতে । পাশাপাশি সক্রিয় ছিলেন সাহিত্যচর্চা, গবেষণা ও লেখালেখির কাজে।
মাহমুদুল হাসান নিজামী একাধারে কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক ছিলেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তিনি বহু কাজ করেছেন এবং তাঁর ১২০ টির বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখা কবিতা, গান ও আবৃত্তিও বেশ পরিচিত।
নিজামী ব্যক্তি জীবনে সাহিত্য ও সাংবাদিকতা ছাড়াও বিভিন্ন সাংগঠনিক পদে কাজ করেছেন এবং কিছু সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন—
জাতীয় কবিতা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জাতীয় সাংবাদিক মঞ্চের সভাপতি, কাউখালী প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছাড়াও তিনি কবিতা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, সাহিত্য সভা, কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং তরুণ সাহিত্যিকদের উৎসাহিত করেছেন।
বহু ভাষাবিদ কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী ২০২৬ খৃস্টাব্দের ০৫ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ ইমরান সোহেল। মোবাইল : ০১৮১৫-৫৬৩৭৯৪ । কার্যালয়: ৪০ কদম মোবারক মার্কেট, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম। ইমেল: [email protected]
Copyright © 2026 Desh Chinta. All rights reserved.