দেশচিন্তা ডেস্ক: শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ, সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সহনশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন ও সহনশীলতার অভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই আগামীর প্রশাসক, শিক্ষক, চিকিৎসক ও নীতি নির্ধারক তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির তৃতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাপ্রাঙ্গণ কনভেনশন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৫,৯০৩ জন শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়, যার মধ্যে ৫,২২৪ জন স্নাতক এবং ৬৭৯ জন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশকে নতুনভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।
তবে শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অন্যান্য নির্বাচনের চেয়ে ভিন্ন উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, এ নির্বাচনে তরুণদের শুধু সরকার গঠন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ও কাঠামো নির্ধারণেও ভূমিকা রাখতে হবে। গণঅভ্যুত্থানে প্রকাশিত সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকার গণভোটে হ্যাঁ–না ভোটের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্কার না হলে পুরনো ব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে—এ কারণে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাছ, ডিম, দুধ ও মাংস মানুষের পুষ্টির প্রধান উৎস হলেও এখনও সবাই তা নিয়মিত পাচ্ছে না। ঘাটতি পূরণের নামে মাংস আমদানি দেশের প্রান্তিক খামারিদের ক্ষতিগ্রস্ত করে; তাই সরকার দেশীয় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে।
তিনি বলেন, পরিবেশ দূষণ ও নদী–নালা, খাল–বিল ভরাটের ফলে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। অতিরিক্ত ও অবৈধ আহরণের কারণে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের তুলনায় সমুদ্রে মাছের পরিমাণ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে।
উপদেষ্টা তরুণদের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য পরিহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ধূমপান হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকসহ নানা অসংক্রামক রোগের প্রধান কারণ। আইন প্রয়োগের অপেক্ষা না করে আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেকে ও সমাজকে রক্ষা করতে হবে।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে সমাবর্তন অনুষ্ঠান শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম। ডিগ্রি প্রার্থীদের উপস্থাপন করেন সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. নূরুর রহমান খান, ব্যবসায় প্রশাসন ও অর্থনীতি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. তাজুল ইসলাম এবং কলা, সামাজিক বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির। অনুষ্ঠানে কনভোকেশন মার্শাল ছিলেন আর্কিটেকচার বিভাগের শিক্ষক আনিকা হাবিব।
সমাবর্তন বক্তার বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস. এম. এ. ফায়েজ বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছে দেশের প্রত্যাশা অনেক। বাবা-মা, শিক্ষক এবং পুরো দেশ তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি বলেন, শিক্ষিত ও আলোকিত মানুষ হিসেবে শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব হলো ভালো ও মন্দের পার্থক্য আরও গভীরভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে অনুধাবন করা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কাজী জামিল আজহারের অনুপস্থিতিতে তাঁর বক্তব্য পড়ে শোনান ট্রাস্টিজ সদস্য ডা. সাগুপ্তা মাহমুদ। তিনি বলেন, সমাবর্তন শিক্ষাজীবনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং জীবনের এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে উত্তরণের মুহূর্ত। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি দায়িত্বেরও সূচনা। গ্রাজুয়েটদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এটি কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও অঙ্গীকারের মাধ্যমে অর্জিত একাডেমিক সাফল্যের উদযাপন।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আজ শিক্ষার্থীরা কেবল একটি ডিগ্রি নয়, ভবিষ্যতে দেশ গড়ার দায়িত্বও গ্রহণ করেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আজকের গ্রাজুয়েটরা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে এর মর্যাদা সমুন্নত রাখবে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়নে উৎকর্ষতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার সাজেদ-উল-ইসলাম। তিনি সমাবর্তন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং শিক্ষার্থীদের পেছনে অভিভাবকদের নীরব সমর্থনের প্রশংসা করেন।
সমাবর্তনে আরো উপস্থিত ছিলেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার এম. এ. গোলাম দস্তগীর, সদস্য কাজী মোজাহার আলী, ইঞ্জিনিয়ার মশিহ্ উর রহমান, ডা. ওয়াহিউদ্দিন মাহমুদ, ইঞ্জিনিয়ার মুশফিকুর রহমান, স্থপতি ইকবাল হাবিব, অ্যাডভোকেট শারমীন আহমেদ মজুমদার, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ব্রি. জে. মো. মাহবুবুল হক (অব.), সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা।
সমাবর্তনে স্নাতক পর্যায়ে চ্যান্সেলর’স গোল্ড মেডেল লাভ করেন খলিলুর রহমান। কাজী আজহার আলী গোল্ড মেডেল পান নুসরাত কবির বৃষ্টি। ভাইস-চ্যান্সেলর’স গোল্ড মেডেল পান শায়েকা লাওলাক, তাজিবা আফরিন ও তানিয়া আক্তার।
একাডেমিক ফলাফলের ভিত্তিতে ডিন’স অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তদের মধ্যে স্নাতক পর্যায়ে রয়েছেন মৌমিতা ভৌমিক সুপ্তি, মোসা. জান্নাতি খাতুন, মো. তারিকুল ইসলাম, প্রিনন মাহদী, মো. মাহমুদ চৌধুরী, দেবারতি ভট্টাচার্য, রাজিয়া খাতুন তুন্না, মরহুম মিতু ফকির, লামিয়া চৌধুরী ও উম্মে হাবিবা শারমিন। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ডিন’স অ্যাওয়ার্ড পান মো. শাহিনুজ্জামান, জান্নাতুল ইসলাম ও নিশাত কাদের। অনুষ্ঠানে অনুভূতি প্রকাশ করেন চ্যান্সেলর’স গোল্ড মেডেল প্রাপ্ত খলিলুর রহমান।
সমাবর্তনের মূল আয়োজন শেষে বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীরা নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে আনন্দ উদযাপন করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ ইমরান সোহেল। মোবাইল : ০১৮১৫-৫৬৩৭৯৪ । কার্যালয়: ৪০ কদম মোবারক মার্কেট, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম। ইমেল: [email protected]
Copyright © 2026 Desh Chinta. All rights reserved.