দেশচিন্তা ডেস্ক: সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মাঝে বই বিতরণ করা হলেও রাঙ্গামাটিতে এই উৎসবে রয়েছে ভিন্নতা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এখানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাঝেও তাদের স্ব-স্ব মাতৃভাষার বই বিতরণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকালে রাঙ্গামাটি শহরের বনরূপা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. কফিল উদ্দিনসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলায় অনাড়ম্বরভাবে নতুন পাঠ্যবই বিতরণ করা হচ্ছে। তবে বই বিতরণকে কেন্দ্র করে পুরো স্কুল ক্যাম্পাস ছিল খুদে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর। তাদের চোখে ছিল নতুন বই হাতে পাওয়ার অধীর আগ্রহ। অবশেষে বই হাতে পেয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে তারা।
পার্বত্য চুক্তির আলোকে পাহাড়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত স্ব-স্ব মাতৃভাষার বই বিতরণ করা হয়। সাধারণ বইয়ের সাথে নিজের ভাষার বই পায় নৃতাত্ত্বিক শিশুরা। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষাভাষী শিশুদের ২০১৭ সাল থেকে এসব বই দেয়া হচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, এবছর প্রাক-প্রাথমিকে চাকমা ভাষায় ৯ হাজার ৯৯৪টি, মারমা ভাষায় ২ হাজার ৪৫০টি ও ত্রিপুরা ভাষায় ৬৯০টি বই বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রথম শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় ১৬ হাজার ২৩৯টি, মারমা ভাষায় ৩ হাজার ৬৩৬টি ও ত্রিপুরা ভাষায় ১ হাজার ৫টি; দ্বিতীয় শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় ১৬ হাজার ৩৮৯টি, মারমা ভাষায় ৩ হাজার ৭৭৪টি ও ত্রিপুরা ভাষায় ১ হাজার ৪৪টি এবং তৃতীয় শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় ৫ হাজার ৭৫৩টি, মারমা ভাষায় ১ হাজার ১৯০টি ও ত্রিপুরা ভাষায় ২৬২টি পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণিতে সাধারণ বইয়ের পাশাপাশি ত্রিপুরা ভাষায় বই পাওয়া শিক্ষার্থী সীমা ত্রিপুরা বলে, ‘সাধারণ বইয়ের সাথে মাতৃভাষার বই পেয়েছি, আমি অনেক খুশি। মাতৃভাষায় স্কুলে পড়ার কারণে নিজ ভাষায় অনেক কিছু পড়তে ও লিখতে পারি।’
অভিভাবক রবীন্দ্র চাকমা বলেন, ‘আমাদের সময়ে স্কুলে নিজ মাতৃভাষায় লেখাপড়ার সুযোগ পাইনি। যার ফলে আমি চাকমা ভাষা বলতে পারলেও লিখতে পারি না। কিন্তু আমার ছেলে সেই সুযোগ পাচ্ছে। সে চাকমা ভাষার অক্ষর চেনে ও লিখতে পারে। এর ফলে আমাদের ভাষা পৃথিবীতে টিকে থাকবে বলে মনে করি।’
আরেক অভিভাবক রীতা চাকমা বলেন, ‘এখন স্কুলে মাতৃভাষা শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এতে করে আমাদের বাচ্চারা তাদের মাতৃভাষা আরও ভালো করে শিখতে পারছে। তবে বিদ্যালয়গুলোতে মাতৃভাষা শিক্ষাদানের শিক্ষক সংকট রয়েছে। দ্রুত শিক্ষক সংকট দূর করা না হলে এই বই দেয়া কোনো কাজেই আসবে না।’
রাঙ্গামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. কফিল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের চাহিদা অনুযায়ী জেলায় ৭০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭৪টি সাধারণ বই এবং স্ব-স্ব মাতৃভাষার (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা) ৬২ হাজার ৪২৬টি বই পেয়েছি। আজ সব বিদ্যালয়ে এসব বই বিতরণ কার্যক্রম চলছে।’
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় শোক থাকায় অনাড়ম্বরভাবে বই বিতরণ করা হয়েছে। পার্বত্য এলাকায় সাধারণ বইয়ের পাশাপাশি মাতৃভাষায় বইও বিতরণ করা হয়েছে। এই মাতৃভাষা শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষকদের বেতন-ভাতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। আমি মনে করি, এতে মাতৃভাষা শিক্ষার মান উন্নয়ন হবে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মদ ইমরান সোহেল। মোবাইল : ০১৮১৫-৫৬৩৭৯৪ । কার্যালয়: ৪০ কদম মোবারক মার্কেট, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম। ইমেল: [email protected]
Copyright © 2026 Desh Chinta. All rights reserved.